কথাঃ আবোলতাবোল

এইসব ঠকদের কাছে ঠকেও সুখ

‘কত করে নিল মাছটা?’

-‘তিনশো।’

-‘ব্যাপক ঠকিয়েছে। বাজার ঘুরে দ্যাখো গে, এ মাছ হয়ত দুশোটাকা কেজিতে সেধে সেধে দিচ্ছে। আরও তুমি রোজ একজনের কাছ থেকে কেনো! দিনের সব লাভটা সন্দীপ মনে হয় তোমার কাছ থেকেই করে নেয়।’

বাজার থেকে ফেরার পর এ হল বাড়ির নিত্যকার কথোপকথন। সন্দীপ আমাকে ঠকায় কিনা জানার উপায়ও নেই। কারণ বাজারে আমাকে দেখতে পেলেই সন্দীপের ডাক-‘তাড়াতাড়ি আসুন,টাটকা রেখেছি আপনার জন্য।’

এত আন্তরিক ডাক কি এড়ানো যায়? আমি যথারীতি ওর কাছে হাজির হই,এবং ঠকি (সত্যি ঠকি কিনা আমি জানিনা, এটা বাড়ির ভারসন)

সন্দীপের আহ্বান আমি এড়াতে পারি না আরও একটা কারণে। বাজারে ঢুকেই আমার মনে হয়,কতক্ষণে বেরোব। সন্দীপ সেক্ষেত্রে মস্ত বড় সহায়। সব খদ্দের ফেলে আমাকে মাছ দেয়। ফলে বাজারে সবচেয়ে দেরি হবার জায়গাটা আমি খুব সহজে পেরিয়ে আসি।

সন্দীপের সবাইকে ফেলে আমাকে মাছ দেবার গল্পটা বাড়িতে করায় জেনেছিলাম,এটা নাকি খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। ব্যবসাটা যার উপর দাঁড়িয়ে তাকে তো আগে দিতে হবেই।

আমার উপর যেমন সন্দীপের ব্যবসা,তেমনি শীতল সাহার ইলেক্ট্রিকেরও ব্যবসাও অনেকটা আমার উপর দাঁড়িয়ে । আমার নয়,বাড়ির মত।

যে কারণে রাত্রি আটটার পরেও বাড়িতে কোনও কিছু বৈদ্যুতিক গন্ডগোল হলে যদি শীতলবাবুকে খবর দিই, উনি পাঁচমিনিটে এসে হাজির হন। এসে কাজটা করে দেন এবং আমাকে বেশ করে ঠকিয়েও দিয়ে যান। কুড়িটাকার কাজে দুশোটাকা নিয়ে।

এই দুজনের মত আরও বহুজন করে খাচ্ছে,স্রেফ আমাকে ঠকিয়ে। যেমন অমিয়। রাস্তার ধারে বেশ চালু সেলুন ওর।

কিন্তু আমি যদি খবর দিই, ‘অমিয় আমরা বাপ ছেলে চুল কাটাব আজ। আসবে?’ সব খদ্দের ফেলে অমিয় মুহূর্তের মধ্যে হাজির। কারণ অতি সহজ। অতি সহজে ঠকাতে পারা যাবে এমন লোকের ডাক। উপেক্ষা করা যায়?

মুদির দোকানের সঞ্জু তো আরও এক কাঠি বাড়া। মাসকাবারি মাল কিছুতেই আমাকে বাড়ি বয়ে আনতে দেবে না। দুটো ব্যাগ আমি স্বচ্ছন্দেই ওর দোকান থেকে বয়ে নিয়ে আসতে পারি, কিন্তু ওর কাছে স্লিপটা দিতেই সঞ্জু বলে ওঠে-‘আপনি চলে যান,বাড়িতে মাল পৌঁছে যাবে।’

এরপর এক-আধ ঘন্টা পরেই সঞ্জু বাড়িতে মাল নিয়ে হাজির। এত খাতিরের কারণ আর কিছু নয়। ওই,আমাকে গুছিয়ে ঠকাতে পারা। এত ঠকালে,চক্ষুলজ্জার একটা ব্যাপার তো থাকেই।

এইভাবে সারাদিন ঠকে ঠকে আমার কিন্তু বেশ মজাই লাগে। কারণ সবাই আমাকে ঠকিয়ে যায়,কিন্তু প্রত্যেকের কাজের ডেলিভারি স্পিড অসাধারণ। এ যুগে তো এরকম ভাবাই যায় না।

ভিতরের কথা না জেনে এজন্য বন্ধুরা আমাকে অনেকে হিংসেও করেন। বলেন, ‘কী নেটওয়ার্ক বানিয়ে রেখেছেন মাইরি!’

কতটা ঠকছি, সেটা পরখ করার সাধ আমার যে মাঝে মাঝে হয় না,তা নয়। কিন্তু একবার হাই স্পিড নেটে অভ্যস্ত হয়ে গেলে কেউকি সেই ধ্যাড়ধেড়ে মান্ধাতা আমলের স্লো স্পিড নেটে ফেরে!

তবু সেদিন সন্দীপের দু সারি পরে বসা আনন্দের কাছে শুধোলাম,একই ওজনের রুই মাছের দাম। আনন্দ বলল,চারশো। আমি নিয়েছি সাড়ে তিনশো করে। তাহলে সন্দীপ কি খারাপ মাছ গছাল আজ?

সন্দীপের কাছে গিয়ে প্রশ্নটা করেই ফেললাম-‘মাছ ভাল দিয়েছ তো সন্দীপ?’

-‘একথা কেন বলছেন?’

-‘না,ওই যে আনন্দের কাছে দেখলাম একই মাছ চারশো। সেজন্যই-’

আমি সেসময় একাই দাঁড়িয়ে আছি,সন্দীপের সামনে। সন্দীপ আমার দিকে তাকিয়ে বলল-‘আপনার কাছে আমি অন্যদের তুলনায় সব সময় পঞ্চাশ একশোটাকা কম নিই। আর সবচেয়ে ভালো মাছটা দেবার চেষ্টা করি।’

কথাটা সত্যি ভাবব না মিথ্যে,এই যখন আমার অবস্থা তখন সন্দীপ বলে ওঠে-‘মনে আছে স্যার,সেই বৃষ্টিবাদলের দিনটার কথা। আমি দাঁড়িয়েছিলাম একটা গাছের তলায়। আপনি আসছিলেন ছাতা মাথায়। আমার ছাতা নেই দেখে আপনি আমাকে ছাতায় ডেকে নিলেন।তারপর নিজের বাড়ি চলে এলে আমাকে ছাতাটা দিয়ে দিলেন বাড়ি যাবার জন্য।

‘এর জন্য কী হয়েছিল জানেন? আমার ছেলেটাকে ঠিকসময়ে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পেরেছিলাম। কারণ বাড়ি পৌঁছে দেখি,প্রবল জ্বরে বেহুঁশ ছেলে। ওকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেরি করলেই কিছু একটা হয়ে যেত সেদিন।’

আমি হতবাক। প্রত্যেকদিন বাজার থেকে ফেরে প্রতারিত এক উজবুক। আজ ফিরল যেন ধনী এক সম্রাট।
সেদিন বাড়িতে চুল কাটতে এসে অমিয় শুধোল-‘স্যার,ক্লাস নাইনের ফিজিক্যাল সায়েন্স বই হবে?’

অমিয়র ভাইয়ের জন্য প্রত্যেকবারই আমাকে কিছু না কিছু বই স্কুল থেকে এনে দিতে হয়। এবারে গোড়াতেই বাংলা আর ইংরেজি সহায়িকা দিয়েছি। লাইফ সায়েন্স আর ফিজিক্যাল সায়েন্সের সহায়িকা ওকে দেব বলে এনে রেখেছিলাম। কোনওটাই দাম দিয়ে কেনা নয়। সহকর্মী বন্ধুদের কাছ থেকে চেয়েচিন্তে আনা।

বইদুটো দিতে অমিয় বলল-‘এই উপকারটুকুর জন্যই তো স্যার আপনি ডাক দিলে সব কাজ ফেলে এখানে ছুটে আসি। দোকানের খদ্দেররা বিরক্ত হয় অনেকসময়। কিন্তু ওদের কাছে আমার সাফ কথা, আগে স্যারের কাজ,পরে আপনাদের।’

অমিয় বাড়িতে এসে চুল কাটার জন্য কোনওদিনই দোকানে চুল কাটার চেয়ে বেশি নেয়নি।তাই আমার উপর ও নির্ভরশীল এমন কথায় আমি কোনওদিন কর্ণপাত করিনি। কিন্তু ডাকা মাত্রই ছুটে আসার পিছনের কারণটা জেনে সত্যিই আমি অবাক। এত সামান্য উপকারেই এই!

এরপর একদিন চোখ খুলে দিলেন শীতল সাহাও। মাধ্যমিক পাশ করেছে ছেলে। আশি শতাংশ নম্বর। ছেলেকে নিয়ে এলেন বাড়িতে। ছেলে প্রণাম করল আমাকে। -‘বাংলায় আর ইতিহাসে সব চেয়ে বেশি পেয়েছে স্যার। এই দুই বিষয়ের নম্বর ওর নয়,আপনার।’

-‘এটা একেবারে ভুল কথা বললেন শীতলবাবু। হতে পারে সময়ে অসময়ে আমি ওকে একটু সাহায্য করেছি,কিন্তু লিখেছে তো ও-ই।’

শীতলবাবু বললেন- ‘বাংলা আর ইতিহাসের টিউশন দিতে পারিনি। সেসময় আপনি না সাহায্য করলে ও হয়ত পাশ করত কিন্তু লেটার পেত না।-জানেন আপনি যখন আমাকে কোনও সমস্যা হলে ফোন করেন,এক আধ সময় আমার অসুবিধা হাজির হলেও আমাকে ঠেলে পাঠায় ও আর ওর মা।’

শীতল সাহার কথা শুনে আমার মনোভাব সেই আগের মতই। এই সামান্য উপকার,কে না কার জন্য করে,কিন্তু তার জন্য সব কাজ ফেলে ছুটে আসা! এ যা ভাবনারও অতীত! টাকাও যে বেশি নে্ন না, একবার শীতল সাহার অসুস্থতার সময় মোড়ের মাথার সুখেনকে এনেই বুঝেছি।

আমার উপর করে খাওয়া সঞ্জুর কথা আর লিখলাম না। কারণ ভেবে ভেবে বের করেছি,ওর ভাইয়ের অপারেশনের সময় রক্ত পাচ্ছিল না। রেয়ার গ্রুপ। কিন্তু মিল আমার সঙ্গে।

সঞ্জুর দোকানে গিয়ে ওর মুখে শুনেই চলে গিয়েছিলাম রক্ত দিতে। এরকম কাজ আজকের দিনে লোকে লোকের জন্য আকছারই করে। কিন্তু আমি জানি সঞ্জুকে টোকা দিলে ওর খাতির
করার পিছনে ঠিক এটাই চলে আসবে।

ছোটবেলায় বাড়ির সামনের জমিটায় ধান লাগানো হত। যখন বীজ ফেলা হত তখন মেরেকেটে এক বস্তা। আর যখন ধান হত তখন উঠোন ধানের বস্তায় ভরে যেত। আমার অবস্থাও সেরকম। কতটুকুই বা ভালবাসা ছড়িয়েছি,কিন্তু ফিরেছে ফিরছে শতগুণ হয়ে।

চারপাশের এইসব ঠকদের কাছে ঠকেও সুখ!

গল্পঃ অণু গল্প (অন্ধকার,আলো)/Anugolpo(ondhokar,alo)

কথাঃবাংলাসাহিত্যে ভূত (Bangla sahitye bhut)