কথাঃআবোলতাবোল (‘যতই নাগরিক হও,জীবনের কোথাও না কোথাও লুকিয়ে রাখ একটা গ্রাম’)

কথাঃ আবোলতাবোল  'যতই নাগরিক হও জীবনের কোথাও না কোথাও লুকিয়ে রাখ একটা গ্রাম।'পুরনো ডায়েরির পাতা ওল্টাতে  গিয়ে আজ হঠাৎ নজরে পড়ল লাইনটা।কী লিখতে গিয়েছিলাম? গদ্য না কবিতা? এক লাইনের পর লেখাটা যে মুখ থুবড়ে পড়েছিল,সে তো বুঝতেই পারছি। কিন্তু কথাটা আজও মানি কি? লুকিয়ে থাকা গ্রামটার জন্য সুবিধা অসুবিধা দুইই আমাকে পোহাতে হয়েছে,এখনও হয়। সুবিধার কথা আগে বলি। গ্রামটা ছিল বলে আজও পাঁচ কিমি রাস্তা অনায়াসে হাঁটতে পারি। রাস্তার ধারের ইট পাতা সেলুনে চুল ছাঁটানোর জন্য বসতে পারি নির্দ্বিধায়। দূরপাল্লার একক রেলযাত্রায় রিজার্ভেশন না পেলেও 'কী হবে' 'কী হবে' না করে বেরিয়ে পড়তে পারি। কিন্তু  ভেবে দেখেছি এসব সুবিধা খুব…

0 Comments

কথাঃআবোলতাবোল (‘এ দীনতা তোমায় মানায় না রাজাধিরাজ’)

কথাঃ আবোলতাবোল পড়াশোনায় খারাপ ছেলে হিসাবে তখন আমি রীতিমত বিখ্যাত।ভুগি হীনমন্যতায়ও। অথচ পড়াশোনাতে মনোযোগীও হতে পারি না।সুতরাং সারাদিন বাড়িতে গঞ্জনা। সঙ্গে উপদেশ, নীলুর মত হতে পার না, নীলুকে দেখে শেখো। একই ক্লাশে পড়া নীলু তখন আমার কাছে বিষ্ময়কর এক প্রতিভা। পরীক্ষায় সব বিষয়ে ফুলমার্কস, অথবা ফুলমার্কসের কাছাকাছি পায়। নীলুর কাছে ঘেঁষতেই ভয় পাই। ক্লাস সিক্সের বার্ষিক পরীক্ষায় আমার সিট পড়ল নীলুর পিছনে। পরীক্ষা বলে কথা! এতদিন কাছে ঘেঁষতে না পারার সংকোচ ফেল করার ভয়ে উবে গেল। অঙ্ক পরীক্ষায় তো বারবারই ওকে খোঁচাতে লাগলাম খাতা দেখানোর জন্য। নীলু স্যারকে নালিশ করে আমার সিট বদলে দিল। শুধু তাই নয়। পরীক্ষার পর বাইরে…

0 Comments

কথাঃআবোলতাবোল (বক্তা প্রচুর,শ্রোতা কম)

কথাঃআবোলতাবোল  এক স্নেহভাজন তাঁর একটা ভ্রমণকাহিনিতে এক জায়গার গুরুত্ব বোঝাতে লিখেছিল,' অনেকেই হয়ত জানেন না...' জাতীয়  শব্দবন্ধ। ওকে বলেছিলাম,তুমি লেখার আগেই কীভাবে ধরে নিলে,যা লিখছ তা অনেকে জানে না? তুমি কি সার্ভে করেছ,নাকি অনুমান? বলার অপেক্ষা রাখে না,অনুজটি ওই ধরণের শব্দবন্ধ আর কখনও লেখায় ব্যবহার করেনি। এই সব লেখার ত্রুটি সব সময় আমরা সচেতনভাবে যে করি তা কিন্তু নয়। পূর্বসূরী কারও লেখার প্রভাব থেকেও হয়। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী সম্পাদিত 'বাংলা কী লিখিবেন,কেন লিখিবেন'এ 'বলাই বাহুল্য' ব্যবহার নিয়ে বেশ কটাক্ষ রয়েছে। 'বাহুল্যই যদি তবে বলা কেন?' এটা পড়ার পর প্রতিবার এই শব্দবন্ধ ব্যবহারের আগে আমি ভেবে নিই একবার। ঠিক এমন সমস্যা গল্পে…

0 Comments

কথাঃআবোলতাবোল (‘কী’ আর ‘কে’)

কথাঃআবোলতাবোল'কী'আর 'কে' এই দুইয়ের মধ্যে লড়াই নতুন নয়। দু একজন গোঁয়ার লোক থাকেন,যাঁরা কিছুতেই 'কী'এর পক্ষ ছেড়ে 'কে'র দিকে যাবেন না। কিন্তু এ সমাজে তাঁরা সংখ্যালঘু। সমাজ সাধারণভাবে 'কে'র দিকে। যেজন্য আপনি যতই ভাল সাহিত্য বুঝুন,সিনেমা বুঝুন,রাজনীতি বুঝুন সমাজ আগে দেখে নেবে আপনি কে,আপনার স্ট্যাটাস কী,আপনার বাজারদর কেমন। এগুলো জুতসই হলে তবে সমাজের কানের দরজা ফাঁক হবে। দুখীরামের কথা ধরা যাক। দুখীরাম দিনমজুর। তাঁর দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না। কিন্তু সেই দুখীরাম একদিন লটারি পেয়ে গেল হঠাৎ। গ্রামের কোনও বিচার সভায় যে দুখীরামের উপস্থিতি কেউ এতদিন নজরও করত না,লটারি পাবার পরে সেখানে হাজির হতে দেখা গেল,তাঁর খাতিরই আলাদা। 'এ ব্যাপারে…

0 Comments

কথাঃআবোলতাবোল(কেমন আছে গ্রামবাংলার বাংলা মাধ্যম স্কুল )

জয়জিৎ দাস অরফে জিপু ভর্তি হয়েছিল সুপ্রিম স্কুলের ফাইভে। কিন্তু ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের বেশিমাত্রার শৃঙ্খলা আর অতিমাত্রার ইংরেজি বলার চাপ ফাইভ সি সেকশনের রোলনম্বর এইটিনাইন জিপুকে একেবারে খাদের কিনারায় পৌঁছে দিল। স্কুল হয়ে উঠল ওর কাছে জেলখানা। এসময় জিপুর জীবনে হঠাৎই ঘটল একটা ঘটনা। চাকরি চলে গেল বাবার।

0 Comments

কথাঃআবোলতাবোলঃ তালগাছ

কথাঃআবোলতাবোল তালগাছ               চাষের জমির মাঝে তালগাছ। লাঙল দিয়ে চষতে গেলে আশপাশ মিলিয়ে অনেকটা জায়গা ছেড়ে দিতে হয়। ভাগচাষী গজগজ করে।.গজগজ করে বাবাও,-‘আর জায়গা পাইলি না,এক্কেরে আমার জমির মইধ্যে  খাড়াইয়া পড়লি!’ প্রথমে আগাছার মত উপড়ে ফেললেই হত। কিন্তু কেন কে জানে তা হয়নি।  এখন বড় হবার পর গজগজ ছাড়া আর উপায় কী! এই অবস্থায় কেটে ফেলার কথা তো বাবার কল্পনাতেও আসবে  না। এক বৈশাখে তাল গজাল গাছটায়। আমরা তালশাঁস খেলাম। সে  ভাদ্রে তালও পাকল। আমরা তাল কুড়োলাম। পাকা তালের রস দিয়ে বড়া হল বাড়িতে। তারপর রস নিংড়ানো তালাআঁটি ফেলা হল দূরে। দূরে,কিন্তু অজানা নিরুদ্দেশে ভাসিয়ে দেওয়া নয়। কারণ ভাদ্র গেলেই আসবে আশ্বিন। তখন এই তালআঁটি গুলোই মাটি থেকে তোলা হবে। কাটা হবে। ভিতর থেকে বেরোবে তালকুসুম। যার ডাক নাম, তালফোঁপরা। সে তালফোঁপরা কোজাগরির সামনে দেওয়া ফলের মধ্যে মিশে যাবে আর একটা ফল হয়েই। একদিন তালপাটালি নিয়ে এল আমাদের বহুদূরের এক ভাগচাষী। খেলাম। চুরিও করলাম। সে কী অপূর্ব স্বাদ! কোথায় লাগে খেজুর গুড়ের পাটালি! দিদি বলল, ‘আমাদের তালগাছের রস দিয়ে  করা যায় না  এমন?’ দাদা বলল, ‘যাবে না কেন?করলেই যাবে,কিন্তু তালগাছ কাটানো, ঠিলি পাতা,রস নামানো,জ্বাল দেওয়া  অনেক হ্যাপা। আর তাছাড়া, একটা গাছের রস আর কতটুকু হবে?’ তালপাটালি করার ভাবনা  তাই শেষ হয়ে গেল আলোচনাতেই । দেখতে দেখতে আমরা ভাইবোনেরা বড় হলাম। তালগাছের বুড়ো হবার কথা নয়,কিন্তু তবু দেখে ওকে বুড়োই মনে হতে লাগল। কেমন একটা শুকনো শুকনো ভাব। তালের কাঁদিও সেভাবে হয় না। পরিচিতরা পরামর্শ দিল,বেচে দিন। বাবা গত। বেঁচে থাকলে একথা ভাবাও যেত না। এখনও বাড়ির অভিভাবকদের মধ্যে একটু দোনামনা যে হল না তা নয়। তবে শেষ অব্দি বেচে দেবার সিদ্ধান্তই নেওয়া হল। খবর পাঠানো হল তালগাছ যারা বেচাকেনা করে তাঁদের কাছে। গ্রামের দিকে তালগাছের তখন বিরাট  চাহিদা। মাটির বাড়ির জুৎসই কড়িবরগার জন্য তখন বাছা হয় ,তালকাঠই। কিন্তু তালগাছ বিক্রি অত সহজ নয়। প্রথমে একদিন এলেন এক সুবেশ ভদ্রলোক। আমরা ভাবলাম,আসল ক্রেতা বোধহয় তিনি। কিন্তু শুনলাম উনি কাঠব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আসছেন গাছ পরীক্ষা করতে। ওঁর কাজ হল তালগাছে কতটা সার আছে দেখা। দেখে,ব্যবসায়ীদের  রিপোর্ট দেওয়া। সেই রিপোর্ট দেখে এবার দরদাম করতে এগিয়ে আসবেন ওঁরা। এমন পেশার লোকও তাহলে আছেন! আমরা তালগাছের সার-টেস্টারের পিছু পিছু চললাম গাছের কাছে। উনি একটা লোহার সরু শলাকা তালগাছে কিছুটা ঢুকিয়ে আবার টেনে নিলেন। বললেন-‘আমার কাজ শেষ।’আমরা তো অবাক। এরপর একদিন এলেন ব্যবসায়ীরা। বললেন, ‘গাছের সার ভালো নেই।’  তবু দাম একটা স্থির হল। কিন্তু কাটা পড়ার আগেই জ্যৈষ্ঠমাসের এক বিকেলে ঝড়ে ভেঙে পড়ল তালগাছটা। সব হিসেব উল্টে গেল আমাদের। আমাদের কারও কারও অবশ্য এও মনে হল যে এতদিনের পুরোনো পিতৃসম গাছ ঝড়ের আশ্রয়ে বিক্রির অপমান থেকে নিজেকে বাঁচাল। এবং আমাদেরও বাঁচাল অপরাধের হাত থেকে।   তালগাছটা থেকেও নেই হয়েছিল বহুদিন। এখন একেবারে নেই হয়ে বোঝা গেল আমার কাছে সে কতটা ছিল। মনে পড়ল, ছোটবেলায় ওই তালগাছের দিকে তাকিয়েই পড়েছি,‘তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে…।’ উদ্বুদ্ধও  হয়েছি। ভেবেছি,একপায়ে ও যদি পারে আকাশ ছুঁতে,দুপায়ে আমি পারবনা কেন! ফাঁকা জায়গাটার দিকে তাকিয়ে লম্বা শ্বাস পড়ে আমার। আর এখন? গ্রামে গিয়ে দেখি কাঁচাবাড়ির চিহ্নও আর নেই। তালগাছের একটা ব্যবহার তার মানে বিলুপ্ত। আমাদের জমিটা অবশ্য আছে। ওদিকে তাকালে কিন্তু মনে পড়ে যায় তালগাছটার কথা। শুধু কি তাই? গ্রীষ্মের দুপুরে গ্রামের বাড়ির বারান্দায় বসে চোখ বুজলে আজও শুনতে পাই, সেই একপায়ে দাঁড়ানো,সব গাছ ছাড়ানো তালগাছটায় একটা কাঠঠোকরা আওয়াজ করে চলেছে-ঠক,ঠক,ঠক…  

0 Comments

End of content

No more pages to load