গল্পঃ নব পথের পাঁচালী

গল্প নব পথের পাঁচালী কে মরবে? অপু না দুর্গা? দুর্গা একবার মরেছে,তাই আবার দুর্গার মৃত্যু হোক আমি চাই না। তাহলে কি অপু? হেসে ফেলি নিজের অজ্ঞতায়। যাকে নিয়ে উপন্যাস,মারা যাবে সে-ই! নিজেকে ধমকাই রেলস্টেশনের বেঞ্চিতে বসে। মৃত্যু কেন? মৃত্যু ছাড়া কি হতে পারে না এই নতুন পথের পাঁচালী? হবে,নিশ্চয় হবে। দুর্গাকে মেরে বিভূতিবাবু আমাদের বড্ড কাঁদিয়েছেন! আমি দুর্গাকে বাঁচিয়ে, অন্যভাবে নির্মাণ করে পাঠকদের আনন্দ দিতে চাই। রোজ বিকেলে চারটে হলেই বসি এই রেলস্টেশনে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করি ওদের। প্রথম দিন থেকেই ওদের মনে হয়েছে অপু দুর্গা। ছোট্ট একটা ভাইয়ের ছোট্ট একটা দিদি,অপু দুর্গা ছাড়া আর কী-ই বা মনে হতে পারে?…

1 Comment

ছোটদের গল্পঃ পুজোর মালা

ছোটদের গল্প পুজোর মালা   খবরটা বেশ কয়েকদিন আগেই কানে এসেছিল। কিন্তু তাতে খুব একটা গুরুত্ব দেননি বরদাবাবু। গুরুত্ব দেবেনই বা কেন? বাড়ির গেটের ঠিক আগে দু পাশে শিউলিগাছের তলা যে শরৎ পড়তেই ফুলে ফুলে ঢাকা। বাজারে যদি ফুল না ও পাওয়া যায়, এ দিয়েই তো কাজ চালানো যাবে। ৷ নিশিকান্ত এ বাড়ির একমাত্র পুরোনো কর্মচারী। তালপুকুরে ঘটি না ডুবলেও দুর্গাপুজোর মতো কিছু পুরোনো ঐতিহ্য যেমন এ বাড়িতে টিকে আছে,তেমনি টিকে আছেন নিশিকান্তও। বন্যার জন্য আশেপাশের বাজার থেকে ফুলের উধাও সংবাদ তিনিই বয়ে এনেছেন। বরদাবাবুর মত শিউলিগাছ দুটোর ভরসায় নিশিকান্তও রয়েছেন,কিন্তু সে বাবদে তাঁর চিন্তাও কিছু কম নেই। বিশেষ করে…

0 Comments

কথাঃআবোলতাবোল -আমার স্কুটি

কথাঃ আবোলতাবোল   আমার স্কুটি     -‘একটা স্কুটি কিনলে কেমন হয়?’ -‘কেমন হয় মানে! বাইক-স্কুটি ছাড়া এযুগে চলে নাকি? রাতবিরেতে কত দরকার পড়ে! বাইক এই বয়সে চালনো শিখতে পারবেন না। কিন্তু স্কুটি চালানো খুব সহজ।’ -‘আমি পারব চালাতে?’ -‘পারবেন না কেন? মেয়েরা চালাচ্ছে-’ -‘মেয়েরা চালাতে পারলেই আমি পারব তার কী গ্যারান্টি! ছেলেরা পারে,এমন কোন কাজটা না   আজকাল মেয়েরা পারছে!’ -‘পারবেন,পারবেন। সাইকেল যখন চালাতে পারেন স্কুটিও পারবেন।’ স্কুটি কেনার আগে এই জাতীয় কথোপকথন আমার কার সঙ্গে না হয়েছে! কিন্তু মনস্থির করেও করতে পারছিলাম না। স্কুটি কেনার কথা মনে হলেই নানা ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনার ছবি আমার মনের মধ্যে এসে হাজির হচ্ছিল।…

0 Comments

কথাঃবাংলাসাহিত্যে ভূত (Bangla sahitye bhut)

কথা বাংলাসাহিত্যে ভূত ‘ভূতের গল্প’র শুরুতে উপেন্দ্রকিশোর লিখেছেন, ‘আমি ভূতের গল্প ভালবাসি। তোমরা পাঁচজনে মিলিয়া ভূতের গল্প কর,সেখানে আমি পাঁচ ঘন্টা বসিয়া থাকিতে পারি।’ শুধু লেখক উপেন্দ্রকিশোর নন,ভূতের গল্প বিষয়ে সকলেরই বোধহয় কমবেশি একই বক্তব্য। সেজন্য বাংলাসাহিত্যে আজও প্রচুর ভূতের গল্প লেখা হয়। ভূত আছে না নেই,সে তর্ক বৃথা। প্রমথনাথ বিশী একটা সুন্দর শব্দযুগ্ম উপহার দিয়েছেন, ‘সুখকর ভীতিবোধ।’ বিশ্বাস বা অবিশ্বাস নয়,ভূতের গল্পে সবাই বোধহয় এটাই পেতে চায়। অন্য গল্প পড়া বা শোনার ক্ষেত্রে হয়তো অনুষঙ্গ লাগে না। কিন্তু ভূতের গল্পের ক্ষেত্রে টিমটিমে আলো,ঘুটঘুটে অন্ধকার আর বর্ষা বা শীতের আবহাওয়া থাকলে বেশ জমে যায়। ভূতের গল্পের শুরুটা করেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। তবে…

0 Comments

কথাঃ আবোলতাবোল-এই সব ঠকদের কাছে ঠকেও সুখ (ei sob thokder kache thokeo sukh)

কথাঃ আবোলতাবোল এইসব ঠকদের কাছে ঠকেও সুখ ‘কত করে নিল মাছটা?’ -‘তিনশো।’ - -‘ব্যাপক ঠকিয়েছে। বাজার ঘুরে দ্যাখো গে, এ মাছ হয়ত দুশোটাকা কেজিতে সেধে সেধে দিচ্ছে। আরও তুমি রোজ একজনের কাছ থেকে কেনো! দিনের সব লাভটা সন্দীপ মনে হয় তোমার কাছ থেকেই করে নেয়।’ বাজার থেকে ফেরার পর এ হল বাড়ির নিত্যকার কথোপকথন। সন্দীপ আমাকে ঠকায় কিনা জানার উপায়ও নেই। কারণ বাজারে আমাকে দেখতে পেলেই সন্দীপের ডাক-‘তাড়াতাড়ি আসুন,টাটকা রেখেছি আপনার জন্য।’ এত আন্তরিক ডাক কি এড়ানো যায়? আমি যথারীতি ওর কাছে হাজির হই,এবং ঠকি (সত্যি ঠকি কিনা আমি জানিনা, এটা বাড়ির ভারসন) সন্দীপের আহ্বান আমি এড়াতে পারি না আরও…

0 Comments

কথা:বকুল কথা (Bokul Katha)

কথা বকুলকথা বসন্ত বন্দনায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-‘নব শ্যামল শোভন রথে,এসো বকুল বিছানো পথে।’  ঋতুরাজ বসন্তের যথার্থ আবাহনই বটে! কেননা শিউলি না এলে যেমন শরতের চলে না,তেমনি বকুল ছাড়াও বসন্ত অপূর্ণ। শীত শেষে প্রকৃতির এই আশ্চর্য উপহার মানুষকে শিউলির মতোই উন্মনা করে দেয়।    একসময় পাতানো সম্পর্কে ‘গঙ্গাজল’ ‘মহাপ্রসাদ’ এর সঙ্গে ‘বকুলফুল’ ছিল বন্ধুত্বের স্মারকচিহ্ন। এছাড়া, যে সময় ফুল দিয়ে পুত্রকন্যাদের নামকরণ করা হত অহরহ,সে সময় শিউলি,জবা ইত্যাদির পাশে বকুলেরও ছিল যথেষ্ট সমাদর। জবা,শিউলির পাশে বকুলের কিছু বাড়তি সুবিধাও ছিল। জবা,শিউলি মানেই তো মেয়েদের নাম। বকুলের ক্ষেত্রে তা নয়। আশাপূর্ণা দেবীর ‘বকুল কথা’ যেমন বকুল নামের একটি মেয়ের গল্প,তেমনি নজরুল ইসলামের ‘বকুল’…

2 Comments

গল্পঃ অণু গল্প (অন্ধকার,আলো)/Anugolpo(ondhokar,alo)

অণুগল্প   অন্ধকার খেজুরগাছের নিচে কীসের একটা আওয়াজ হল। খড়মড়। চারদিকে জমাট অন্ধকার। কৃষ্ণপক্ষ চলছে। স্বদেশ  টর্চটা জ্বালাল। দেখতে পেল না কিছুই। তবু সাবধান হল। সিতুদের বাড়ির পুরো রাস্তা টর্চটা জ্বালিয়েই রাখল। -মামিমা! সিতুদের ঊঠানে এসেই হাঁকল স্বদেশ। -সোদেশ আইসস নাকি ? আয় আয়।    -আজ কী অন্ধকার মামিমা! আর আপনাদের রাস্তাটাও খুব জঙ্গলে ভরে গেছে। -তোর মামা তো লুক খুঁজতাসে কাটনের লেইগ্যা। আজকাল লুক মেলাই দুষ্কর। পূজা আইতাসে। ঝুপঝাড় একটু না কাটলে পোলাপানেরা রাইতে ঠাকুর দেখতে বাইর হইব কুন সাহসে! সিতু ইত্যবসরে চা বানিয়ে হাজির ।– স্বদেশদা চা। -আবার চা করলি কেন? - লবানকে দেখছি না! স্বদেশ তাকাল এদিক সেদিক। -লবানরে একটু দুকানে পাঠাইসি। তেল আনতে। এই সিতু একটু যা তো হ্যারিকেনডা লইয়া। অন্ধকারে নিমগাছটার তলে ও খুব…

0 Comments

কথাঃ আবোলতাবোল (বাঁকা কঞ্চি)

কথাঃআবোলতাবোল বাঁকা কঞ্চি সময়টা যদি হয় সকাল দুপুরের মাঝামাঝি আর কালটা যদি হয় গ্রীষ্ম তবে গ্রামের পথে বে্রোনো ছোট  ছেলেটার হাতে একটা বাঁকা কঞ্চি থাকা মানেই তো সে দিগ্বিজয়ী বীর। অন্তত সেরকমই ছিল আমাদের সময়টায়। তখন মর্নিংস্কুল থেকে বাড়ি ফিরে গরমভাতে উদরপূর্তি আর তার পরেই সটান রাস্তায়। দৌড় দৌড় দৌড়। আর দৌড়ের সঙ্গী অবশ্যই একটা বাঁকা কঞ্চি। বাঁকা কঞ্চিরও তখন অভাব ছিল না। এখানে বাঁশবন, ওখানে বাঁশবন। বাঁকা কঞ্চি দিয়ে কখনও বাতাস কাটতাম,কখনও অকারণে রাস্তার পাশের ঝোপঝাড়ের উপর শাসন চালাতাম আবার কখনও বাঁকা কঞ্চিটা শূন্যে তুলে ধরতাম তরবারির কায়দায়।  সেসময় পুরাণ ইতিহাসের সন তারিখ সব সরিয়ে রেখে কখনও কর্ণ হয়ে যুদ্ধ…

0 Comments

কথাঃ আবোলতাবোল (চেয়ার)

কথাঃআবোলতাবোল চেয়ার -‘প্লাস্টিকের চেয়ার নেবে?’   পুরোনো কাগজ ওজন করতে করতে অল্প বয়সী ছেলেটা আমার প্রশ্ন শুনে ঘাড় ঘোরায়।-‘ভাঙা?’ -‘একেবারে ভাঙা নয়। এখনও বসা যায়।’ -‘দাম কিন্তু ভাঙারই পাবেন।-কটা আছে?’ -‘কটা আবার? একটা।’ কাগজ ওজন প্রায় শেষ। চেয়ার নেবার জন্য ঘরে ঢুকি। কিন্তু বাধা আসে ভিতর থেকে–‘নতুন  না কিনে ওটা দিয়ে দিচ্ছ যে! এই সময়ে চেয়ার কিনতে নিশ্চয় বাইরে যাবে না!’   এখন বাধা। অথচ চেয়ার বিক্রির তাড়া কিন্তু তার জন্যই। কদিন আগে চেয়ারের পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে শাড়ি ছিঁড়ে গিয়েছে ভাঙা জায়গায় আটকে। তবে এই পরিস্থিতিতে কথাটায় যুক্তি আছে। কাগজ কেনার ছেলেটাকে কাগজের দাম বুঝে নিয়ে  বিদায় করি। আমার বসার চেয়ারটা ভেঙেছে কিন্তু আজকে নয়। আর তাতে যে আমার খুব অসুবিধা হচ্ছে তাও নয়। হেলান দেওয়ার অংশটায় দুপাশের দুটো জায়গা বসার অংশটা থেকে ছেড়ে গেছে। এতে বরং আমার আরামই হচ্ছে। প্লাস্টিক চেয়ারে বসে রিভলভিং চেয়ারের মজা পাচ্ছি। ভাঙা চেয়ারে দোল খেতে দেখলে বাড়ির আর একজনের চোখ অবশ্য কপালে ওঠে। -‘এভাবে দোল খেলে,একদিন কিন্তু পড়বে হুড়মুড় করে!’ কথাটা হয়ত মিথ্যে নয়। কিন্তু কম্পিউটারের সামনে বসে যখন কিছুই লেখার খুঁজে পাই না,তখন এপাশে ওপাশে দোল খেলে দেখেছি চিন্তাতেও দোলা লাগে। মনেই আসে না,এভাবে দোল খেলে পড়েও যেতে পারি।   যখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল, তখন কিন্তু চেয়ারটা অনেকবারই পাল্টানোর কথা হয়েছে। আর আমি একেবারে গা করিনি তাও নয়। তবে এ ব্যাপারে আমার তো একেবারে বেহিসেবি হলে চলে না। আমি চাই দাম কম হবে,জিনিসও ভাল হবে। এই মন নিয়ে একবার বেরিয়েওছিলাম চেয়ারের সন্ধানে। কিন্তু চেয়ারের দাম আর আমার পছন্দকে এক জায়গায় আনতে পারিনি। অগত্যা এক দোকান থেকে নিয়ে এসেছিলাম চেয়ারের বিকল্প হিসাবে প্লাস্টিকের একটা টুল। আমার কম্পিউটার টেবিলের কাছে ওটা নিয়ে বসতে গিয়ে দেখি আরেক সমস্যা।  কম্পিউটার মনিটরটাকে বিঘৎ খানেক তুলতে হবে। কাজেই ওটা বাতিল হয়ে এখন ড্রইং রমে। একবার অ্যামাজনে একটা বেশ সস্তায় রিভলভিং চেয়ার দেখে অর্ডার দিয়েছিলাম। কম্পিউটার টেবিলের  সামনের সংকীর্ণ জায়গায় ওটাকে রাখতে অসুবিধা হবে জেনেও। কদিন পরে রিভলভিং চেয়ার আসার পরিবর্তে এসেছিল চেয়ারে বসার কুশন। আমি তাজ্জব। কম্পিউটার  খুলে দেখি,সত্যি ওটা কুশনেরই ডিসপ্লে ছিল। নাহলে পাঁচশো পঁচানব্বই টাকায়… -‘ভালো চেয়ার তোমার কপালে জুটবে না।’ দৈববাণীর মত সেদিন ভেসে এসেছিল রান্নাঘরের বাণী। কথাটা মাঝে মাঝে তলিয়ে ভেবে দেখি, আমার জীবনেও এর চাইতে বড় সত্যি আর কিছু নেই। জুৎসই চেয়ারের ভাগ্য আমার সত্যি নেই। আমি তখন কাগজে ইতস্তত লিখছি। যদিও বিশাল কিছু নয়। কিন্তু তবু ছাপার অক্ষরে তো বটে!আর কাগজগুলোও খুব অনামা নয়। সেসময় বাড়ি গেলে গ্রামের লাইব্রেরিতে যাওয়ার একটা অভ্যেস আমার ছিল। সেবার সেখানে যেতেই লাইব্রেরিয়ান একগাল হেসে বললেন-‘এবার জানুয়ারির তেইশেতে নেতাজির উপর এসে কম্পিটিশন হচ্ছে। তোমাকে আমারা এই কম্পিটশনে পেতে চাই।’ আমি আহ্লাদে গদগদ। কিন্তু সে আহ্লাদ বেশিক্ষণ টিকল না। কারণ,আমি ভেবেছিলাম থাকতে হবে জাজের  ভূমিকায়। লাইব্রেরিয়ান বললেন-‘বেশি প্রতিযোগী হয়নি। লিখে নিচ্ছি তাহলে তোমার নামটা!’ অল্প বয়সে চাকরিতে ঢোকার কারণে তিন জায়গা মিলে আমার বত্রিশ বছর চাকরি হয়ে গেল। কিন্তু কোথাও বাড়তি চেয়ার তেমন কেউ দেয়নি। এক জায়গায় আমার পদোন্নতি হয়েছিল। ছেড়ে আসা অব্দি সে পদেই বহাল ছিলাম। কিন্তু সে চেয়ারের অবস্থা আরও খারাপ। ডিউটিতে গেলে বাড়তি দশ টাকা,না গেলে ফক্কা। আবার রোজ গেলেও কোনওভাবেই মাসে বাড়তি দুশো টাকার বেশি নয়। আমাকে যখন এই চেয়ার দেওয়া হয়,তখন অনেককেই বিভিন্ন পদের চেয়ার দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেসব চেয়ারগুলো কিছুদিন যাবার পরেই পোক্ত হল,নড়বড়ে থেকে গেল শুধু আমারটাই। এখন নেপোটিজম নিয়ে কত কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এই নেপোটিজমের স্বাদই আলাদা। এ স্বাদের ভাগ হবে না। ও হ্যাঁ,বলতে ভুলে গেছি,ওটা কোনও বেসরকারি সংস্থা কিন্তু নয়। খাঁটি সরকারি। পরের চাকরিতেও তথৈবচ। যে কাজটা একটু আধটু পারি,সে কাজের ভার  কর্তৃপক্ষ আমাকে দিতে গেলেই আড়ালে ফিসফাস। আমার অনুপস্থিতে কর্তৃপক্ষের কাছে দরবার। ফলে আমার যা স্বভাব। রাগ করে আমিই  ঠেলে দিয়েছি চেয়ারটা। চেয়ার নিয়ে এখন আর আমার কোনও আফশোস নেই। এদেশে চেয়ারম্যান হতে গেলে যে যোগ্য হতে হয়, এ ধারণা আমার কাছে  ক্রমবিলীয়মান। ছোটবেলায় ইতিহাস বইতে আমরা অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত ছবি দেখতাম। মাথাকাটা কনিষ্ক,সশিং আলেকজেন্ডার। এরকমই আর একটা ছবি ছিল পিঠে চেয়ার নেওয়া হিউয়েন সাঙের। এমন সব ছবির পিছনের আসল সত্যিটা আমাদের এখন জানা। তবু ছেলেবেলার কম বুদ্ধিতে বোঝা,ওই চেয়ার-পিঠে হিউয়েন সাঙের ছবিটা আমার আজও কেমন সত্যি-সত্যি লাগে। মনে হয়,এ ছবি নয়। মেসেজ। আর  একেবারে তা হক কথা। এদেশে চেয়ার মেলা অত সহজ নয়। তার চেয়ে একটা নিজের চেয়ার বানিয়ে নেওয়া ঢের ভাল।  এ চেয়ার পুরোপুরি সেফ। এখান থেকে পড়ে যাবার সম্ভাবনা নেই। নেই চেয়ার হারিয়ে যাবার ভয়ও। আর যেহেতু এ চেয়ারে দাক্ষিণ্যের চিহ্ন থাকে…

0 Comments

কথাঃআবোলতাবোল (বাংলা প্রবাদের পুনর্লিখন প্রস্তাব)

কথাঃ আবোলতাবোল বাংলা প্রবাদের পুনর্লিখন প্রস্তাব স্টিফেন লিককের একটা ইংরেজি প্রবন্ধ পড়েছিলাম।'ওল্ড প্রোভার্বস মেড নিউ'। প্রবন্ধটিতে বেশ কয়েকটা ইংরেজি প্রবাদ নিয়ে লেখক আলোচনা করে দেখিয়েছিলেন বাস্তবে কীভাবে প্রবাদ প্রবচনের ঠিক উল্টো ঘটনা ঘটে থাকে। প্রবাদগুলোকে নতুনভাবে লেখার কথাও লেখক ওখানে বলেছিলেন।ঘটনা হল,ইংরেজির মত বাংলাতেও কিন্তু অসংখ্য প্রবাদ-প্রবচন ছড়িয়ে আছে যেগুলোর মনে হয়,ওই একই কারণে পুনর্লিখন প্রয়োজন। যেমন ধরা যাক,'বোবার শত্রু নেই'। খুবই চালু প্রবচন। কিন্তু এখন এটা  ঠিক মানা যাবে কি? বোবা বলতে এখানে শারীরিকভাবে বোবাদের কথা কিন্তু বলা হচ্ছে না। যারা ইচ্ছাকৃত বা স্বভাবগতভাবে চুপচাপ থাকে,কথা হচ্ছে তাদের নিয়েই। এদের শ্ত্রু নেই,একথা কিন্তু একেবারেই ঠিক নয়। বরং এদের শত্রু অন্যদের…

0 Comments

গল্পঃ সাহিত্য/সাহিত্যিক (অভিনব পাওনাদার…)

গল্পঃ সাহিত্য/সাহিত্যিক অভিনব পাওনাদার সেদিন কলেজস্ট্রিটে এক অভিনব পাওনাদারকে দেখা গেল। সাধারণত পাওনাদারের ভয়ে ঋণী ব্যক্তিকে  গা ঢাকা দিতে দেখা যায়। কলেজস্ট্রিটে সেদিন উল্টো দৃশ্য। ঋণী ব্যক্তিকে দেখে পাওনাদারই ছাতা দিয়ে নিজের মুখ আড়াল করার চেষ্টা করছেন। পাওনা টাকার পরিমাণও কম নয়। গত শতকের তিনের দশকের শেষ দিক সেটা। পাওনা টাকা পাঁচশোর মূল্য তাই অনেকটাই। পাওনাদার ব্যক্তিটি আর কেউ নন। বিভূতিভূষণ। ঋণী ব্যক্তিটিও উচ্চশিক্ষিত,আদর্শবাদী,বিলাতফেরত। নাম অশোক গুপ্ত। বিকলাঙ্গ,অপরিণতবুদ্ধি শিশুদের নিয়ে একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল অশোক  গুপ্ত ও তাঁর স্ত্রীর। এজন্য দরকার গ্রাম্য নির্জন একটা পরিবেশ। পছন্দ হয়েছিল ঘাটশিলার এক জনহীন স্থান। তৈরি করেছিলেন ছোট্ট একটা বাড়ি। অশোক গুপ্তের সঙ্গে বিভূতিভূষণের পরিচয় ওই সময়েই। বিভূতিভূষণ তাঁদের সাধনার কথা শুনে শুধু তাঁদের উৎসাহই দেননি। আর্থিক দুরবস্থা তখন লেখার দৌলতে অনেকটাই তাঁর ঘুচেছে। অশোক গুপ্তকে তাঁদের আর্থিক অসুবিধার জন্য পাঁচশো টাকা ধারও দিয়েছিলেন। এই ধার গুপ্তসাহেবের মনে না থাকার কথা নয়। কিন্তু তিনি নানাভাবে জড়িয়ে পড়লেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানও  একসময় নিঃশেষ হয়ে গেল। স্বাস্থ্যও ভেঙে পড়ল তাঁর।   ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও বিভূতিভূষণ গুপ্তসাহেবের খোঁজ নিতে পারলেন না। পাছে গুপ্তসাহেব ভাবেন,টাকার  জন্যই এই খোঁজ। এরপরের ঘটনা ওই কলেজ স্ট্রিটের। কিন্তু ছাতা দিয়ে মুখ আড়াল করার আগেই সেদিন অশোক গুপ্ত  দেখে ফেলেছিলেন বিভূতিভূষণকে। -‘বিভূতি না!’ বলেই এগিয়ে এসে বিভূতিভূষণের হাতটা ধরে ফেললেন তিনি। বললেন-‘আমার একটা উপকার করতে হবে। না বললে হবে না। বল করবে!’ মানুষটির উপর বিভূতিভূষণের প্রগাঢ় শ্রদ্ধা। বললেন-‘নিশ্চয় করব। বলুন দাদা।’   -‘আমাকে ঋণমুক্ত করতে হবে। তোমার পাওনা টাকার বিনিময়ে ঘাটশিলার ওই বাড়ি নিয়ে।’ বিভূতিভূষণ প্রচন্ড আপত্তি জানালেন।-‘তা কেমন করে হবে? একখানা বাড়ির দাম পাঁচশো টাকার অনেক  বেশি!’ অশোক গুপ্ত নাছোড়। বিভূতিভূষণ বললেন,-‘বেশ। কিন্তু পাঁচশোতে নয়। আর কত টাকা আপনাকে দিতে হবে বলুন।’ গুপ্তসাহেব বললেন, -‘না, আর কিছুই তোমাকে দিতে হবে না।’ এরপরে গুপ্তসাহেব রেজিস্ট্রি করে বাড়িটা দিয়ে দিলেন বিভূতিভূষণকে। বিভূতিভূষণ বাড়ির নাম রাখলেন-‘গৌরীকুঞ্জ’। প্রয়াত স্ত্রীর নামে। বিভূতিভূষণের অনেক অসামান্য সৃষ্টির সঙ্গে এই ‘গৌরীকুঞ্জ’ জড়িয়ে আছে। ছুটি পেলেই বিভূতিভূষণ ছুটে যেতেন ওখানে। সপরিবারে ওখানে থাকতেন ভাই নুটুবিহারীও। এখানেই ১৯৫০ সালের ১ নভেম্বর সন্ধ্যায় প্রয়াত হয়েছিলেন বিভূতিভূষণ।   তর্কযুদ্ধ তর্ক বেঁধেছে তিন সাহিত্যিক বন্ধুর মধ্যে। একদিকে দুজন।  অন্যদিকে একজন। একজনকে কিন্তু দুজন কিছুতেই পেরে উঠছেন না। তর্কে পেরে না ওঠার সেই একজন ঘোরতর রবীন্দ্রবিরোধী। অন্য দুজন আবার উল্টো। প্রবল রবীন্দ্রভক্ত। রবীন্দ্রভক্ত দুজনের চেষ্টা রবীন্দ্র-বিরোধী বন্ধুটির মন থেকে তাঁদের প্রিয় মানুষটি সম্পর্কে সব বিদ্বেষ দূর করা। ফলে শুরু হয়েছিল আলোচনা। রবীন্দ্রবিরোধী বন্ধুটির আরাধ্য দেবতা বঙ্কিম,রবীন্দ্রনাথের নামটাও তিনি শুনতে পারেন না,বাড়িতেও রবীন্দ্রনাথের প্রবেশ নিষেধ।  তাঁর এক আত্মীয় রবীন্দ্রনাথকে তীব্রভাবে আক্রমণ করে বই লিখেছেন,‘রবিয়ানা’। সেই বইয়ের  কথা,তাঁরও কথা। ফলে তাঁর সঙ্গে দুই বন্ধুর আলোচনা রূপ নিয়েছে তর্কে।  তর্কটা চলছে…

0 Comments

কথাঃ গরুর গাড়ির ক’টি চাকা

গরুর গাড়ির ক'টি চাকা আলাপনের বিয়েতে বরযাত্রী যাচ্ছি। পিচঢালা মসৃন রাস্তা। চারচাকা এসিতে আলাপন। পাশে আমরা ক'জন।-'আমার বিয়েতে সবাই গিয়েছিলাম বাসে।'  কিছুটা যেতেই বললেন এক বয়স্ক সহকর্মী।সমবয়সী সহকর্মী বন্ধু  তমাল এক বয়স্ক সহযাত্রীকে শুধোল-'কাকু আপনিও কি বাসে গিয়েছিলেন বিয়ে করতে?' বরবেশী আলাপন রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলল-'কাকুর বিয়ের গাড়ির কথা শুধোচ্ছিস? আমি জানি। বাবার মুখে শোনা। কাকু বিয়ে করতে গিয়েছিল দশচাকার গাড়িতে।'-'দশচাকার গাড়ি!' তমাল শহুরে ছেলে,বুঝতে না পেরে তাকাল আলাপনের দিকে।আমি হেসে বললাম-'দশচাকার গাড়ি মানে হল গরুর গাড়ি।'দশচাকার গাড়ির রসিকতা  তমাল বোঝেনি।   এখনকার শহুরে ছেলেরা তো আরও বুঝবে না!  গ্রামের ছেলেরাও কি বুঝবে? সেদিন গ্রামের বাড়িতে শরৎচন্দ্রের মেজদিদি দেখছিলাম টিভিতে। সেই…

0 Comments

কথাঃ আবোলতাবোল (কাঁঠাল)

কথাঃআবোলতাবোল কাঁঠাল এবার বাড়ির বাগানে লিচু ধরেছিল অপর্যাপ্ত। এখন শুনছি আমও নাকি অঢেল। কিন্তু কাঁঠাল? এটা তো কাঁঠালেরও কাল। কাঁঠালের কথা তো বাড়ির কারও ফোনে শুনছি না। কাঁঠাল নিয়ে আমার আগ্রহ কম। তাই কাঁঠালের কথাটা আমিও বারে বারেই শুধোতে ভুলে যাচ্ছি। কাঁঠাল কি তবে হয়নি,নাকি যা হয়েছে এঁচোড় অবস্থাতেই শেষ! আরও একটা কথা অবশ্য মনে হচ্ছে। আমার যেমন আগ্রহ নেই বলে  শুধোতে  ভুলে যাচ্ছি,ওদের দিক দিয়েও ব্যাপারটা সেরকম নয় তো! মনে মনে গুনি। হ্যাঁ,এদিক সেদিক মিলিয়ে তো কম নয়। সাত সাতটা কাঁঠাল গাছ। কোনওটাতে  খাজা,কোনওটাতে রসখাজা,কোনওটাতে গোলা,কোনওটাতে রুদ্রাক্ষী। হরেক কিসিম। রুদ্রাক্ষী কাঁঠালগাছটা বাবার খুব প্রিয় ছিল। এ গাছের কাঁঠাল বাবা একাই একখানা খেতেন। আসলে খুব বড় সাইজ তো নয়। কিন্তু কী মিষ্টি! এ কাঁঠাল শেয়ালদের খুব প্রিয় বলে এর অন্য নাম শেয়াল-খাগি। আমারা অবশ্য রুদ্রাক্ষী,শেয়াল-খাগি কোনওটাই কোনওদিন বলিনি। আমারা এর মধুর স্বাদের জন্য একে বরাবর ডেকে এসেছি ‘মধু-কাঁঠাল’ নামে। এককালে গাছে কাঁঠাল পাকলে আমাদের আনন্দের সীমা থাকত না। আর এখন? পাকা কাঁঠাল খাওয়াই হয় না। আম কাঁঠালের সময় বাড়ি গেলেও,আমই খাই। কাঁঠাল খাবার কথা মনেই হয় না। কাঁঠালের এখন যা কিছু খাতির তা এঁচোড় অবস্থাতেই। এ ঘটনা যে শুধু আমার বেলাতেই তা কিন্তু নয়। পাকা কাঁঠাল-ভালবাসা লোক সব জায়গাতেই এখন কম। কেউ কেউ তো আবার এর গন্ধটাও সহ্য করতে পারেন না। অথচ কাঁঠালের কিন্তু এককালে আমের মতই  আদর ছিল। ঘুমপাড়ানী মাসিপিসির গানে কাঁঠালকে আমের সমান গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে, ‘আমাকাঁঠালের বাগান দেব/ছাঁওয়ায় ছাঁওয়ায় যেতে,/উড়কি ধানের  মুড়কি দেব/পথে জল খেতে।’ পশ্চিমা রামায়ণে হনুমানের কাঁঠাল ভক্ষণের বর্ণনা দিতে গিয়ে পন্স অর্থাৎ  কাঁঠালকে অমৃতের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। শোনা যায় স্বয়ং মহাপ্রভু এই ফলটি বড় ভালবাসতেন। এ কালের রথী মহারথীরা কেউই কাঁঠাল-রসে নিজেদের বঞ্চিত রাখেননি। দীনবন্ধু মিত্র কাঁঠালে এত মজেছিলেন যে কাঁঠাল কোষকে ভালবাসার সঙ্গে এক করে দেখেছেন। ‘পল্লীচিত্রে’র চিত্রকর দীনেন্দ্রকুমার রায় তো আম লিচু নয়,শুধু কাঁঠালেরই ভক্ত ছিলেন। পরশুরামের কেদার চাটুজ্যে যেভাবে কাঁঠাল-কীর্তন করেছেন,তাতে বোঝা যায় ফলটি রাজশেখর বসুরও কম প্রিয় ছিল না। রাজশেখর বসুর দাদা শশিশেখর বসু তো ‘খাজা কাঁঠাল’ শিরোনামে আস্ত একটা রম্যরচনাই লিখে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ আম ভালবাসতেন,   ভালবাসতেন এঁচোড়ের নানা পদ। কিন্তু কাঁঠালের সেভাবে গুণগ্রাহী না হলেও একেবারে অনাদর করতেন না ফলটিকে। শিলাইদহ থেকে জোড়াসাঁকোয় তিনি একবার কাঁঠাল পাঠিয়েছিলেন। ১২৯৮ বঙ্গাব্দে অভিজ্ঞা দেবীর কবিপত্নীকে লেখা এক চিঠিতে এরকমই এক ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। ওদিকে ‘রূপসী বাংলা’র কবির তো সাধই ছিল,’কুয়াশার বুকে ভেসে আসিব এ কাঁঠাল ছায়ায়।’ মনে আছে,ছেলেবেলায় কাঁঠাল পাকলে তার খুশবুতে আমরা যেমন লাফিয়ে উঠতাম,তেমনই সাড়া পড়ে যেত পশুপাখিদের মধ্যেও। ভোঁদর,হোঁদর,হুড়ার,শেয়াল,হনুমান একে একে সকলেই হাজির হত মঞ্চে। আর এদের হাত থেকে পড়ে যাওয়া,ঝুলে থাকা পাকা-আধপাকা কাঁঠাল বাঁচাতে আমাদের কত কসরৎই না  করতে হত। এখনও নিশ্চয় এইসব প্রাণীদের মধ্যে একই চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। কাঁঠাল নিয়ে উৎসাহ নিভেছে,তাই খোঁজও রাখি না,কীভাবে এখন এদের তাড়ানো হয়।  

0 Comments

প্রিয় লেখক (শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়)

 সাহিত্যিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় ‘আমি যত্ন করিয়া লিখি,লেখাকে চিত্তাকর্ষক করিবার চেষ্টা করি। তাই প্রথম পাঠে বোধহয় লেখার চাকচিক্যই চোখে পড়ে। চাকচিক্য ছাড়া তাহাতে যে আর কিছু আছে তাহা কেহ লক্ষ্য করেন না। অনেকে পরে আবার লেখাটি পড়িলে তাহার অন্তর্নিহিত বস্তুটি চোখে পড়ে।‘ নিজের লেখা সম্পর্কে ডায়েরিতে একথা লিখেছিলেন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। তারিখ ৪ঠা জানুয়ারি,১৯৫২। ওই একই লেখায় তিনি জানিয়েছিলেন,তাঁর লেখা পাঠকদের আকৃষ্ট করার কারণ,তাতে রয়েছে একটা immediate appeal যা মোহিতলালের ভাষায় ‘ত্বরিতানন্দ’। আসলে একজন লেখক টিকে থাকেন লেখার মধ্যে দিয়ে নিজের বিশ্বাস,আদর্শকে সঠিক ও সুন্দরভাবে প্রতিফলিত করার মাধ্যমে। একেই হয়ত শরদিন্দু বলতে চেয়েছেন লেখার ‘অন্তর্নিহিত বস্তু’। এই ‘অন্তর্নিহিত বস্তু’ গোয়েন্দা  কাহিনি বা ভৌতিক কাহিনিতে সেভাবে ফুটিয়ে তোলা যায় না। এরজন্য দরকার পড়ে অন্যধরণের লেখা। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে এই অন্য ধরণের লেখা হল ইতিহাসের কাহিনি। এর  মধ্যেই তিনি তাঁর জীবনচেতনা পরিস্ফুট করার চেষ্টা করেছেন। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখালেখি শুরু হয়েছিল ১৯২৯ সালে। আর তাঁর জন্ম সেই বাংলাসাহিত্যের জন্য খুব পয়মন্ত সাল ১৮৯৯ এ। ১৮৯৯ সালটি পয়মন্ত কেননা এই সাল  ধারণ করে আছে শরদিন্দুর সঙ্গে  জীবনানন্দ ও নজরুলের জন্মতারিখ। শরদিন্দু জন্মেছিলেন ৩০ মার্চ,উত্তর প্রদেশের জৌনপুর শহরে। বাবা তারাভূষন বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন মুঙ্গেরের ডাকসাইটে উকিল। ম্যাট্রিক পাশ করেই শরদিন্দু চলে আসেন কলকাতায়। কলকাতায় কেটেছে ১৯১৫ থেকে ১৯১৯ সাল অব্দি। বিএ পাশ করেন কলকাতা থেকে, ল তেও ভর্তি হন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আইন পাশ করেন পাটনা থেকে। কবিতা দিয়ে সাহিত্যের যাত্রাপথ শুরু। একটি কাব্যগ্রন্থও প্রকাশ করেন-‘যৌবন স্মৃতি’। পাকাপাকিভাবে লেখায় আসেন ১৯২৯ সালে। ছোটবেলা থেকেই ডিটেকটিভ গল্পের পোকা ছিলেন। দেশি বিদেশি গোয়েন্দা কাহিনি গিলতেন গোগ্রাসে। কলকাতায় পড়াকালীন শহুরে মানুষজনকে খুঁটিয়ে লক্ষ্য করছেন। লিখতে এসে  ভাবলেন,গোয়েন্দা কাহিনি লিখলে কেমন হয়। লিখতে পারবেন,এ বিশ্বাস ছিল। ১৯৩৩ এ শুরু করলেন প্রথম গল্প ‘পথের কাঁটা’ দিয়ে। ‘পথের কাঁটা’ সহ প্রথম তিনটি গল্প ছাপা হল ‘মাসিক বসুমতী’তে। বাংলা সাহিত্যের পাঠক সাদরে গ্রহণ করল গোয়েন্দা ব্যোমকেশ বক্সীকে। নিজে বন্দ্যোপাধ্যায়,কিন্তু গোয়েন্দা বক্সী,এ নিয়ে পার্থ চট্টোপাধ্যায় এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে মজা করে বলেছিলেন-‘আমার ধারণা কায়স্থরা ব্রাহ্মণদের চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধি ধরে।’ শরদিন্দুর গোয়েন্দা কাহিনি তাঁর লেখার প্রসাদগুণে নিছক গোয়েন্দা-কাহিনি হয়ে থাকল না। হয়ে উঠল সামাজিক উপন্যাস। কিন্তু তবু,শুধু গোয়েন্দা কাহিনি নিয়ে শরদিন্দুর মত শক্তিশালী লেখক এগিয়ে যাবেন,তা হতে পারে না। গোয়েন্দা কাহিনির পাশে ছোটবেলা থেকেই শরদিন্দুর প্রিয় ছিল ঐতিহাসিক কাহিনি।  রমেশচন্দ্র দত্তের ‘রাজপুত জীবন সন্ধ্যা’, ‘মহারাষ্ট্র জীবন প্রভাত’ পড়েছিলেন মুগ্ধ হয়ে। এরপর   বঙ্কিমচন্দ্র পড়ে অভিভূত হয়ে গেলেন। গোয়েন্দা কাহিনির পাশাপাশি এবারে চলল পুরোদমে ঐতিহাসিক উপন্যাস,গল্প লেখা। শরদিন্দুশরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন-‘ইতিহাসের গল্প লিখেই বেশি তৃপ্তি পেয়েছি। মনে কেমন একটা সেন্স অব ফুলফিমেন্ট হয়।’  কিন্তু কেমন হল তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাস? সুকুমার সেন লিখেছেন-‘আগেকার লেখকদের মতো  শরদিন্দুবাবু দূরবীনের চোঙার মধ্য দিয়ে কিম্বা নাকে দূরদৃষ্টির চশমা এঁটে ইতিহাস হাতড়াননি বা খোঁজ  চালাননি। ইনি যেন চোখে কন্ট্যাকট লেন্স লাগিয়ে ইতিহাসকে হাতের নাগালে পেয়েছিলেন। …দূরের দৃশ্যপটকে নিকটে এনে দূরের মানুষকে কাছের করতে পেরেছেন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়।’  সত্যিই তাই। যেজন্য যে ঐতিহাসিক কাহিনি বঙ্কিমচন্দ্রের হাতে একদা বর্ণময় হয়েছিল,শরদিন্দুর হাতে তা হল গল্পময়। স্বাভাবিকভাবেই গল্পপ্রিয় বাঙালি তাঁর ঐতিহাসিক রচনা গ্রহণ করল পরম সমাদরে। শুধু সেদিন নয়। ব্যোমকেশ- কাহিনির পাশে বাঙালি আজও পড়ে তাঁর ‘গৌড়মল্লার’ ‘তুঙ্গভদ্রার তীরে’ ইত্যাদি ঐতিহাসিক রচনা। সাধারণত গোয়েন্দা-কাহিনির লেখকদের গোয়েন্দার জনপ্রিয়তায় চাপা পড়ে যায় তাঁর অন্যান্য সাহিত্যকীর্তি। যেমনটা হয়েছিল দীনেন্দ্রকুমার রায়ের ক্ষেত্রে।  দীনেন্দ্রকুমারের রবার্ট ব্লেকের গোয়েন্দা কাহিনির জনপ্রিয়তার আড়ালে তাঁর জীবদ্দশাতেই লোকে বিষ্মৃত হয়েছিল তাঁর অনুপম সাহিত্যকীর্তি-‘পল্লীচিত্র’, ‘পল্লীবৈচিত্র্য’। সুখের কথা,শরদিন্দুর ক্ষেত্রে তা হয়নি। ১৯৩৮ সালে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় বোম্বে পাড়ি দেন। চলচ্চিত্রে চিত্রনাট্য লেখার কাজ নেন। ১৯৫২ সালে সিনেমার সঙ্গে সব সম্পর্ক ছেদ করে সম্পূর্ণভাবে আত্মনিয়োগ করেন লেখায়। পাকাপাকি বাস করতে থাকেন পুণায়। যে কোনও গোয়েন্দা কাহিনির লেখক তাঁর সৃষ্ট গোয়েন্দাকে প্রাণের চেয়ে ভালোবাসেন। লেখকের ভাব-ভাবনা অনেকটাই গোয়েন্দাটি বহন করে থাকে। একবার প্রতুল চন্দ্র গুপ্তের সঙ্গে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের  সরস পত্রালাপ হয়েছিল ব্যোমকেশকে গাড়ি দেওয়া হবে কিনা তা নিয়ে। এই সরস পত্রালাপ প্রতুল চন্দ্র গুপ্ত লিখে গেছেন। সেখানে দেখা যায় ব্যোমকেশকে নিয়ে তাঁর পিতার মতই চিন্তাভাবনা। ব্যোমকেশকে গাড়ি দিতে  লেখক প্রথমে রাজি  হচ্ছিলেন না। সত্যবতীর ডিমান্ড বেড়েই চলেছে,ব্যোমকেশের হাত  দেখেছি-ওর বরাতে গাড়ি নেই ইত্যাদি নানান অজুহাত খাড়া করছিলেন। শেষ অব্দি একটা সেকেন্ডহ্যান্ড গাড়ি দেবার ব্যাপারে রাজি হন। লেখা শুরু করেন ‘বিশু পাল বধ’ গল্প। কিন্তু সে লেখা অসমাপ্ত রেখেই লেখক পাড়ি দেন অমর্ত্যলোকে। তারিখটা ১৯৭০ এর ২২শে সেপ্টেম্বর।   

0 Comments

কথাঃ আবোলতাবোল (‘বন্ধু বিনে প্রাণ বাঁচে না…’)

কথাঃ আবোলতাবোল  বন্ধু বিনে প্রাণ বাঁচে না অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলে,ধরতে একটু বাধো বাধো ঠেকেই। তবু না ধরেও পারা যায় না। কারণ অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলে শুধু বিরক্তিকর অভিজ্ঞতাই হয় না,অনেক গুরুত্বপূর্ণ খবরও মাঝেসাঝে মিলে যায়। লকডাউনের বাজারে সেদিন সন্ধেয় একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন এল। ইতস্তত করে ধরে যেই বলেছি ‘হ্যালো’,অমনি একটা জড়ানো কাঁপা-কাঁপা পুরুষ গলার আবৃত্তি-‘জীবন গিয়াছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার…’।‘রং নাম্বার’ বলে কাটতে যাব ফোনটা,এমন সময় ওই জড়ানো কন্ঠ বলে ওঠে-‘চিনতে পারলি  না!আমি দীপ্তেন্দু,-নবীন। ফেসবুক থেকে ফোননম্বর  যোগাড় করে  ফোন করছি।’   মুহূর্তেই হু হু করে ছুটে চলে এল বাল্যকাল ;‘হরিহর আত্মা’ দুই কিশোরের বন্ধুত্ব। খুলে গেল হৃদয়ের  উদারা-মুদারা। কে যেন বলেছিল, বন্ধুত্বের চেয়ে বড় প্রেম আর নেই। মনে হল কথাটা মিথ্যে নয়। যাঁরা একেলা জগৎ ভুলে পড়ে থাকেন আপন সংসার-কূলে,তাঁদের কথা আলাদা। কিন্তু গড়পড়তা বেশিরভাগ মানুষেরই ,পরিবার,আত্মীয়স্বজন যতই থাক বাইরের পৃথিবীটা চিনতে জানতে সর্বোপরি বেশ কিছু অনুভূতি শেয়ার করতে বন্ধু ছাড়া চলে কি! হয়ত এ সম্পর্কও কখনও প্রতারণার ফাঁদ  পাতে। ঈর্ষায় জর্জরিত হয়। লোভের খপ্পরে পড়ে। অনেকসময়  চলে আসে ছুরি,রিভালবারও। তবু বন্ধুত্বের বন্ধন এড়াবে কে? বন্ধুত্ব আমাদের অনেকের কাছেই বড় মায়ায় গড়া শব্দ। তাই একে খুন হতে দেখলে বুকে বাজে। যে  কোনও সম্পর্কের মত এখানেও টানাপোড়েন থাকতে পারে। কিছু ঈর্ষার কাঁটা, কিছু সন্দেহের তীর, উত্তরজীবনে আর্থিক অসাম্য জনিত কিছু উপেক্ষার চাহনি এসে একে বিব্রতও করতে পারে কখনওসখনও, কিন্তু উপসংহার  কোনও একজনের মৃত্যু দিয়ে  শেষ হলে তা  খুবই পরিতাপের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। অল্পবয়সের বন্ধুত্ব যদি দুজনেরই জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যায় তাহলে সে-বন্ধুত্ব ঘিরে সমস্যা আসা নতুন কিছু নয়। আমাদের সাহিত্যে এর অনেক উদাহরণ রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের ‘চোখের  বালি’তে বিনোদিনীকে  ঘিরে মহেন্দ্র আর বিহারীর বন্ধুত্বের কথাই ধরা যাক। মহেন্দ্র আর বিহারীর বন্ধুত্বের সম্পর্ক তো মাঝে মাঝেই ঠোক্কর খেয়েছে। দু বন্ধুর মধ্যে দূরত্বও তৈরি হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুই বন্ধুর আশৈশব অটল বন্ধুত্বের মহামূল্যই স্বীকৃত হয়েছে মহেন্দ্রর উপলব্ধির মাধ্যমে।   ‘গোরা’তে গোরা ও বিনয়ের বন্ধুত্বেও টানাপোড়েন এসেছে। তবে ‘চোখের বালি’র মত কোনও ত্রিকোণ  সমস্যাজনিত টানাপোড়েন নয়।এখানে দুই বন্ধুর সাময়িক দূরত্ব তৈরি হয়েছে দুজনের আদর্শ ঘিরে। কিন্তু বন্ধুত্ব তা বলে হারিয়ে যায়নি। উপন্যাসের শেষই হয়েছে আনন্দময়ীর এই উক্তি দিয়ে-‘গোরা,এইবার একবার বিনয়কে ডেকে পাঠাই।’ রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসে টিকে থাকা বন্ধুত্ব আরও আছে।যেমন ‘চতুরঙ্গ’এ শচীশ,শ্রীবিলাস। এ বন্ধুত্ব অবশ্য শৈশবে গড়া নয়। বিএ পড়তে এসে শ্রীবিলাস শচীশের বন্ধুত্বে বাঁধা পড়ে।মাঝখানে দামিনী সংযোগে এখানেও একটা ত্রিকোণ প্রেমের আবহ তৈরি হয়। কিন্তু বন্ধুত্ব বধ্যভূমিতে যায় না,বরং রক্ষিত হয় অশেষ গরিমায়।  আদর্শ বন্ধুত্ব বলতে যা বুঝি বাংলাসাহিত্যে তাও নেহাৎ কম নেই। এর মধ্যে সেরা হবার মত বন্ধুত্বটি সম্ভবত রচনা করে গেছেন শরৎচন্দ্র। ইন্দ্রনাথ-শ্রীকান্তের বন্ধুত্ব। এই বন্ধুত্ব ছেলেবেলায় আমাদের কাকে না  উত্তেজিত,উদ্বুদ্ধ করেছে! এখানে কোনও টানাপোড়েন নেই,কোনও অশুভ ছায়াপাত নেই,বন্ধুত্ব এখানে যথার্থই প্রেমে পর্যবসিত। ইন্দ্রনাথের দুঃসাহসিক অভিযান,মানবিক কর্মকান্ডের শ্রীকান্ত শুধু সঙ্গী নয়, মুগ্ধ দর্শকও। তাই হয়তো সেসবের বর্ণনা চিরকালের মত গেঁথে গেছে আমাদের মনে।    ‘পথের পাঁচালী’র অপু-পটু জুটির যাত্রা ইন্দ্রনাথ-শ্রীকান্তের মতই কৈশোরের বাঁকে থেমে গেছে। কিন্তু এই বন্ধুত্বও যতটুকু পাতা জুড়ে,সবটুকুই মধুরতায় ভরা। হয়ত এই বন্ধুজুটি বাংলাসাহিত্যে তত বিখ্যাত নয়,  কিন্তু   মনে রাখার মত তো বটেই। মালিন্যহীন এই বন্ধুত্ব অপুর নিশ্চিন্দিপুর ছাড়ার পরে একদা মামজোয়ানের মেলায় চকিতে  ফিরে এসে অচিরকালের মধ্যেই আবার দূরে চলে যায়। আমাদের অনেক দূরে যাওয়া-সরে যাওয়া বন্ধুত্বের মতই।     আসলে বন্ধু কেউ থাকে,কেউ চলে যায়,আবার নতুন বন্ধু এসে যোগও দেয় জীবনের স্রোতে। এটাই নিয়ম। আর এখন তো সোস্যাল মিডিয়ার যুগ। এতে একবার প্রবেশ করলে অজস্র বন্ধুর হাতছানি। বন্ধু নিয়ে একসময় আমাদের উপর পরিবারের নানা নিষেধাজ্ঞা থাকে। এর সঙ্গে মেশা যাবে না,ওর সঙ্গে কম মিশবে ইত্যাদি। গড়ে ও বেড়ে ওঠার বয়সে বন্ধু নির্বাচনে সাবধান করে দেওয়াটা অভিভাবকদের অন্যায় নয়। কিন্তু পরিণত বয়সে কে সাবধান করবে? অথচ সোস্যাল মিডিয়ায়…

0 Comments

কবিতা অঙ্ক ক্লাস

সিক্সে এসে আবৃত্ত দশমিক কষাই;মনে হয়,শুধু সংখ্যা নয়,এই বিদ্যামঠতল,দিনের পরে দিন যে গেল সব;এমনকী প্রেম তাও-এক নিরন্তর পৌন:পুনিক।  তাই তো আলো জ্বলে বার বার;অক্ষর শিল্প হয়ে ফিরে ফিরে লেখে:বেকুব যাতনাবিলাস।গতানুগতিকের অঙ্ক এখানেই বাউল হয়।

0 Comments

ঠিকানা

ঠিকানা তুমি যদি ব্রড কোশ্চেন হওআমি এমসিকিউতুমি লিখে চলো পাতার পর পাতাআমি দিয়ে চলি ক্রশ অথবা টিকতুমি যখন কেশব নাগ খুলে চৌবাচ্চার নল সামলাওআমি তখন বাইনারিতে চেপে আকাশে উড়িআকাশে উড়তে উড়তে বলিঃলাভ একটা ওয়ার্ড,প্রেম একটা পালসতোমার সাম্রাজ্যবিস্তার আর যুদ্ধের কাহিনির পাশেআমার সাফ কথাঃহার অথবা জিততবে তুমি অ্যাড্রেস মানে বোঝো ঠিকানাএই জায়গাতে আমি দাঁড়িয়ে যাইআমি দেখি, এমসিকিউ নয়,একটা ব্রড কোশ্চেনআমার দিকে তাকিয়ে আছে স্থির,অপলক।

0 Comments

End of content

No more pages to load