গল্পঃ সাহিত্য/সাহিত্যিক(প্রথম এন্ট্রান্স)

Ami Mishuk | আমি মিশুক গল্পঃসাহিত্য/সাহিত্যিক (প্রথম এন্ট্রান্স)

প্রথম এন্ট্রান্স  

এখন নাম উচ্চ মাধ্যমিক,একসময় এর সমতুল পরীক্ষা ছিল এন্ট্রান্স। বাংলায় বলা হত প্রবেশিকা। এই পরীক্ষা দিয়েই তখন স্নাতক স্তরে ভর্তি হওয়া যেত।
এ দেশে প্রথম এন্ট্রান্স বা প্রবেশিকা চালু হয়েছিল কবে? শুরু খুঁজতে গেলে আমাদের কিন্তু অনেকটাই পিছিয়ে যেতে হবে। সালটা ১৮৫৭। সিপাহী বিদ্রোহের বছর হিসাবে যে সালটা আমরা সবাই মনে রাখি। এই ১৮৫৭ সালেই  এন্ট্রান্স  নামে প্রথম শুরু হল আজকের উচ্চ মাধ্যমিক। 
আয়োজক ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছিল ১৮৫৭ সালেই। ১৮৫৭ সালের জানুয়ারি মাসের ২৪ তারিখ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দিন। গভর্নর জেনারেল লর্ড ক্যানিং ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম আচার্য। আর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জেমস উইলিয়ম কোলভিল ছিলেন প্রথম উপাচার্য বা ভাইস চ্যান্সেলার।
স্থাপনের পরে পরেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিভিন্ন স্তরের পরীক্ষা গ্রহণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রথমেই সিদ্ধান্ত নেয়,এন্ট্রান্স পরীক্ষা  নেওয়ার। কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করে,আগামী এপ্রিল মাসে এন্ট্রান্স পরীক্ষা নেওয়া হবে। এন্ট্রান্স পরীক্ষার বিষয়ও দিয়ে দেওয়া হয়।
প্রথম এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেওয়ার জন্য আবেদন পড়ে  ২৪৪ জনের। এই ২৪৪ জনের মধ্যে ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়,সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর,কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য,গুণেন্দ্রনাথ ঠাকুর, শিশিরকুমার ঘোষ, যোগেন্দ্রচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ বেশ কয়েকজন, যাঁরা পরবর্তীকালে বিখ্যাত হয়েছিলেন।
এই এন্ট্রান্স পরীক্ষায় কোনও তৃতীয় বিভাগ ছিল না। ছিল শুধু প্রথম আর দ্বিতীয় বিভাগ। প্রথম বিভাগ বরাদ্দ করা হয়েছিল,যারা পঞ্চাশ শতাংশ নম্বর পাবে তাদের জন্য। আর দ্বিতীয় বিভাগ ২৫ থেকে ৪৯ শতাংশ পাওয়াদের জন্য।
বঙ্কিমচন্দ্র ১৮৮৬ সালে হুগলি কলেজ থেকে ট্রান্সফার নিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজের আইন বিভাগে ভর্তি হন। প্রেসিডেন্সি কলেজের আইন বিভাগ থেকেই বঙ্কিমচন্দ্র প্রথম এন্ট্রান্স পরীক্ষায় বসেন। সেবার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষায়  বসেছিল মোট ২৩ জন।
কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য ছিলেন সংস্কৃত কলেজের কৃতী ছাত্র।বিদ্যাসাগর মশায়ের স্নেহধন্য। সংস্কৃত কলেজ থেকেই এন্ট্রান্স দেন তিনি। স্মৃতিকথায় কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য লিখেছেন,’১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে  য়ুনিভার্সিটি স্থাপিত হইলে,ওই বৎসরই এন্ট্রান্স পরীক্ষা দিয়া সংস্কৃত কলেজ ত্যাগ করিলাম।’
হিন্দুস্কুল থেকে পরীক্ষা দিয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর,গুণেন্দ্রনাথ  ঠাকুর এবং যোগেন্দ্রচন্দ্র ঘোষ। এই পরীক্ষায় পাশ করার কিছুদিন পরেই বন্ধু মনোমোহন ঘোষের পরামর্শে সত্যেন্দ্রনাথ আইসিএস দেওয়ার জন্য চিন্তাভাবনা শুরু করেন। জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর স্মৃতিকথায় রয়েছে সেসব গল্প।
হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় আগে পড়েছেন নানা জায়গায়। শুরু খিদিরপুর বাংলা স্কুলে। তারপর হিন্দু স্কুল। কিন্তু অর্থাভাবে এখানকার পড়া চালাতে পারেননি বেশিদিন। তিনি এন্ট্রান্স দিয়েছিলেন উত্তরপাড়া স্কুল থেকে।
শিশিরকুমার ঘোষ পড়তেন কলুটোলা ব্রাঞ্চ স্কুলে। এই স্কুলের বর্তমান নাম হেয়ার স্কুল। শিশিরকুমার ঘোষ এই স্কুল থেকেই বসেন এন্ট্রান্স পরীক্ষায়।
যে সব বিখ্যাত ব্যক্তিদের কথা বলা হল,কেমন হয়েছিল তাঁদের এন্ট্রান্সের ফল? এককথায় ভালো। সবাই  প্রথম বিভাগে পাশ করছিলেন। সেবার প্রথম বিভাগ কিন্তু কমজন পায়নি। ২৪৪ জনের মধ্যে ১১৫ জন প্রথম বিভাগে পাশ করেছিল। আর দ্বিতীয় বিভাগ পেয়েছিল ৪৭ জন। বাদবাকিরা অকৃতকার্য হয়েছিল,বলাই বাহুল্য।
সেকালের ওই পরীক্ষার সঙ্গে একালের সমতুল পরীক্ষাটির অনেক কিছুই মিলবে না। তবে পরীক্ষা ঘিরে ভয়,টেনশন,পরীক্ষা ও রেজাল্টের আগের রাত্রি বিনিদ্র কাটানো আজকের মতো হয়তো সেকালেও ছিল। এবং বোধহয় একটু বেশিই ছিল। কারণ প্রবেশিকা বৈতরণী পেরোনো সেযুগে সহজ ছিল না মোটেই।