গল্পঃপাস্ট টেন্স

14 / 100 SEO Score

 

Ami Mishuk | আমি মিশুক গল্পঃপাস্ট টেন্স

গল্প       

পাস্ট টেন্স                         

সারাদিন টিপটিপ করে পড়ছিলই। সন্ধের পর সেটা বিশাল আকার ধারণ করল। একেবারে ‘বাদলের ধারাপাত’ বলতে যা বোঝায় তাই। পশ্চিমের জানলাটা দিয়ে সচরাচর বৃষ্টির ছাঁট ঘরে ঢোকে না। তাই বৃষ্টির সময় ওটা খোলাই থাকে। আজ কিন্তু বন্ধ করতে হল জানলাটা।

পিকো পড়তে বসেই এ ঘর থেকে চেঁচাল-‘মা আজ রাত্রে ভাত রুটি কিচ্ছু নয়-আজ খিচুড়ি।’

অনিমেষ আজ অফিস থেকে ভিজে এসেছে। খিচুড়ির কথায় ওর মনটা নেচে উঠল। পিকোর পাশে বসে ল্যাপটপে কাজ করতে করতে বলল-‘এরকম দিনে খিচুড়ি হলে একেবারে জমে যাবে।’

-‘সঙ্গে ডিমভাজা,কী বলো বাবা!’

-‘ঠিক তাই। ছোটবেলায় এরকম ওয়েদার হলে তো বাড়িতে একেবারে বাঁধা ছিল খিচুড়ি ডিমভাজা। মা এর সঙ্গে অবশ্য আলু ভাজা,বেগুন ভাজাও করত। আর মার তৈরি খিচুড়ি-যেমন অপূর্ব তার গন্ধ,তেমনি চমৎকার তার স্বাদ। তুই তো খাবার সুযোগ পেলিনা। তোর জন্মানোর আগেই মা চলে গেল।…আর মা তো শুধু খিচুড়ি নয়,যে কোনও রান্নাতেই একেবারে তোদের ভাষায় ‘ফাটিয়ে’ দিত।’  

ঠাকুমার রান্নার গল্প বাবার কাছে অনেকবার শোনা। অন্য সময় হলে পিকো আলাদা কোনও কথা পেড়ে বাবাকে থামাত।আজ ইচ্ছে হল না। বর্ষার দিনে পুরোনো কথা শুনতে বেশ ভালই লাগে। ঠাকুমার রান্নার গল্প আজ তাই পিকোর খারাপ লাগছিল না।

অনিমেষ মায়ের রান্নার গল্পে ঢুকে গেলে একটু বেশি ইমোশোনাল হয়ে পড়ে।আজও তাই।অনিমেষ বলে চলে-‘একবার আমার জন্মদিনে মা ভাঁপা ইলিশ এমন রান্না করেছিল যে সবাই খেয়ে একেবারে মুগ্ধ।’

-‘বাপ মেয়েতে কী কথা হচ্ছে গো?’  সিরিয়ালের বিজ্ঞাপন বিরতিতে দীপিকা ও ঘর থেকে এসে দাঁড়ায় ওদের মাঝখানে।

পিকো বলে-‘ঠাকুমার রান্নার কথা।’

পিকোর কথায় দীপিকার চোখেমুখে একটা নিস্পৃহ ভাব ফুটে ওঠে। বলে-‘তার মানে তোর বাবা এখন পাস্ট টেন্সে!’

আসলে শাশুড়ির সঙ্গে সদ্ভাব ছিল না দীপিকার।  কারণে অকারণে বড্ড কথা শোনাতেন মহিলা। মনে আছে,পিকো তখনও হয়নি। সেসময় এমনই এক বৃষ্টির দিনে শ্বশুর বাড়ির দেশের বিখ্যাত শ্রাবণীমেলা দেখতে গিয়ে দুজনে খুব ভিজে ফিরেছিল। ‘তুমি ছেলেটাকে ভিজিয়ে নিয়ে এলে’দিয়ে শুরু করে শাশুড়ি সেদিন দীপিকা্র বাপান্ত করে ছেড়েছিলেন।

দীপিকা বলে-‘আমি প্রেসেন্ট টেন্সের লোক। হয়ত রসভঙ্গ করলাম।’

অনিমেষ দীপিকার শেষ কথাকে পাত্তা না সিয়ে আগের কথার খেই ধরেই বলে-‘ষাট হয়ে গেল,এখন কি আর সবসময় প্রেসেন্ট টেন্সে থাকা যায়? মন তো বয়সে একটু অতীতচারী হবেই-’

এবারে ঝাঁঝিয়ে উঠল দীপিকা।–‘এই বয়সে একটু অতীতচারী! তুমি তো বরাবরই অতীতের লোক।কতবার  বলেছি,একটা এ্সি কেনো-এত  গরমে টেকা যাচ্ছে না,রান্নাঘরটা কালি হয়ে যাচ্ছে-একটা চিমনি বসাও।বলেছি একটা ভাল টিভি কেনো-এই মান্ধাতা আমলের চোদ্দ ইঞ্চি টিভিতে আজকাল আর চলে না। কোনটাতে কান দিয়েছ তুমি? কোনও কিছু চাইলেই বলেছ,ওটা ছাড়াও তোমাদের কেমন সুখের ছিল আগেকার দিন! আর এখন ষাটে এসে বলছ-’

দীপিকার কথার ঝড়ে অনিমেষ মিইয়ে যায়। পিকো পরিবেশ সহজ করার চেষ্টা করে।-‘মা,খিচুড়িতে একটু ঘি দিয়ো,ভাল লাগবে।’

-‘ঘি আছে কি? তাছাড়া রাতের বেলা -তেলেই ভাল।’ একটু ওভার রিঅ্যাক্ট করে ফেলেছে,দীপিকা বোধহয় বোঝে। তাই আর আগের কথায় যায় না।

একটু পরে রান্নাঘরে বাসনের টুংটাং শুরু হয়। মানে ওখানে শুরু হুয়ে গেছে খিচুড়ির আয়োজন। বাবা কি একটু মিইয়ে আছে? পিকো বাবাকে চাঙ্গা করার চেষ্টা করে। বলে-‘বাবা,ইউটিউবে রবীন্দ্রনাথের  ‘এমন দিনে তারে বলা যায়’গানটা চালাও না!’

-‘শুনবি?’

-‘দুজনেই শুনব।’

অনিমেষ ইউটিউবে গানটা চালিয়ে চোখ বোজে। পিকো খুশি,ঠিক অস্ত্রই বেছেছে বাবার মুড ফেরানোর জন্য। গানটা শেষ হলে পিকো উঠে মাকে সাহায্য করতে রান্নাঘরে যায়।

গান থামতে ঘড়ি দেখে অনিমেষ। আর একটু পর থেকে একটা হিন্দি সিরিয়াল শুরু হবে। এ সিরিয়ালটা দীপিকা আর ও দুজন মিলে দেখে। অনিমেষ ল্যাপটপ গুটিয়ে টিভির ঘরে যায়। কিন্তু দীপিকা কোথায়? এখনও কি অনিমেষকে ঝাড়ার মুডে আছে! তাহলে হয়ত…

অনিমেষ ব্যালকনিতে গিয়ে অবাক। দেখে,চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে দীপিকা।  বৃষ্টির ছাঁট ওর গায়ে মুখে লাগছে,তবু ভ্রুক্ষেপ নেই। 

-‘বৃষ্টিতে কী করছ এখানে?’

-‘দেখছি।–আচ্ছা,তোমাকে খুব খারাপ কথা বলে ফেলেছি তাই না!’

-‘খারাপ কথা?তা একটু-আসলে কী জান,রোজগার কম হলে অতীত ছাড়া আর কোথায় আশ্রয় নেব? এখনও পিকোর পড়া বাকি-কত টাকা-নাহলে যা বলছ-’

-‘কেমন ব্যাঙ ডাকছে দ্যাখো। একেবারে আমাদের সেই ছেলেবেলার বর্ষাকাল যেন!’ কথা ঘোরায় দীপিকা।

-‘এটা কোন টেন্স হল?’ মৃদু হাসে অনিমেষ।

-‘আবার ওসব কেন!’ গলা নামিয়ে দীপিকা বলে-‘দিনগুলো কেনন হুহু করে চলে গেল,তাই না!’

ব্যালকনি থেকে দীপিকা বাইরে হাত বের করে বৃষ্টি নেয়।দেখাদেখি অনিমেষও।দুজনে আবার একসঙ্গে তাদের বৃষ্টিতে ভেজার দিনে। 

পিকো মাকে ডাকতে এসেও ফিরে যায়। ডিমটা আজ পিকোই ভাজবে।      

Leave a Reply