কবে ফিরবে গতিমার্কা জীবন
কবে ফিরবে গতিমার্কা জীবন

কবে ফিরবে গতিমার্কা জীবন

 

 

 

 

এনামেলের  বাসন কি এখনও কারও বাড়িতে আছে? কিছুদিন আগেও একটা এনামেলের বাসন কিন্তু বেশ যত্ন আর কদর পেত আমাদের বাড়িতে। সকালে ওটা মাজা হত সবার আগে। তারপর ঠাকুরের ফুল তুলে এনে রাখার জন্য ওটা রাখা হত বারান্দার এক কোনায়। বাসন মানে আসলে একটা রেকাবি। উপরটা সাদা। তলাটা সবুজ। রেকাবিটার কথা আজ হঠাৎ মনে পড়ল। মনে পড়ার কারণ রেকাবির পিছনের সবুজ অংশের একটি লেখা। লেখাটা একটা বাঘের ছবি ঘিরে।
‘লড়াই মিটিল,এখন বাঘমার্কা এনামেলের বাসন যথেষ্ট পাইবেন।’
কোন লড়াই মেটার কথা আছে তা আমরা কেউই ঠিকমত জানতাম না। মার মুখে এটা কেনার সময়কালের কথা যা শুনেছিলাম তাতে মনে হয়েছিল, এটাতে হয়ত চিন ভারত লড়াই থামারই কথা রয়েছে।
হ্যাঁ, সে লড়াই থেমেছিল।
কিন্তু আমাদের এখনকার লড়াই? যদিও এ লড়াইয়ে আমাদের প্রতিপক্ষ মানুষ নয়, ভাইরাস। তবু লড়াই তো, এবং বলা যায় খুব কঠিন লড়াই। এ লড়াই কবে থামবে? বিশকে বিষ মনে হয়েছিল। এবার একুশে করোনার রাক্ষুসে আচরণে আমাদের কাছে বিশের অভিজ্ঞতাও তত বিষময় মনে হচ্ছে না।
চেনা মানুষের মধ্যেই প্রতিদিন চলে যাওয়ার খবর। ফেসবুক খোলা যায় না। বন্ধুবান্ধদের ফোন এলেই আতঙ্ক নিয়ে ফোন ধরি। আবার উল্টোদিকেও এমনই আতঙ্ক। চেনা লোকের মর্নিং মেসেজের প্রত্যুত্তর দিতে দেরি হলেই ফোন আসে, সুস্থ তো?
আমরা কেউই তেমন কেউকাটা নই। প্রত্যেকেরই চেনাজানার বৃত্ত প্রায় একই রকম, এবং তাকে ছোটই বলা যায়। সেই ছোট বৃত্তেই যদি এত ঝরে যাওয়ার শব্দ, তবে সারা রাজ্য বা দেশ জুড়ে কী চলছে তা সহজেই অনুমেয়। সংক্রমণ আর মৃত্যুর সরকারি পরিসংখ্যান সব কিছু বলে দেয় না। সরকারি পরিসংখ্যান তো নথিভুক্ত রোগীর উপর ভিত্তি করে তৈরি। এর বাইরের হিসাবটা কে দেয়!
এই হিসাবে কিছু অতিরঞ্জন থাকতে পারে, কিন্তু সেটাকে বাদ দিয়েও যা থাকে তাতে ভয় পাওয়ার কারণ যথেষ্টই।
এমন আতঙ্কময় পরিবেশের দায় যে অনেকটাই আমাদের তা বলার অপেক্ষা রাখে না। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসছে খবর পেয়েও আমরা সেভাবে সতর্ক হইনি। বরং কোভিড-বিধি মানার ক্ষেত্রে ঢিলে দিয়েছি অনেকটাই। বড় শহরগুলোতে রাস্তাঘাটে ভিড় প্রাক-করোনা পর্বে চলে গিয়েছিল। মাস্ক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও চলে এসেছিল লাগাম ছাড়া শৈথিল্য। এর উপর বেশ কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচন এসে একেবারে পথে বসিয়ে গিয়েছিল আমাদের।
যে হারে টিকাকরণ হওয়া উচিত ছিল, সেটাও হয়নি। এখনও এই নিয়ে নানা জটিলতা। এবং সেই একই চিত্র, অপ্রতুলতা। স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে টিকা নেওয়ার লম্বা লাইন। করোনা আটকাতে গিয়ে করোনার খপ্পরে পড়ে যাওয়ার সেখানে সমূহ সম্ভাবনা।
গৃহবন্দী থাকতে থাকতে বড়রা এখন হাঁফিয়ে উঠেছেন। আর শিশুরা? পরিচিত এক ডাক্তার বলছিলেন, এখন ততটা অনুমান করা যাবে না, করোনা মিটলে বোঝা যাবে করোনা কী কী কেড়ে নিয়ে গেল তাদের। এরই মধ্যে লকডাউন অথবা বাধানিষেধের সময় বেড়ে গেল জুনের পনেরো অব্দি।
বিশে মানুষ কোমর বেঁধে লেগেছিল, বন্দী জীবনে ভাল থাকবেন বলে। কেউ মেতেছিলেন গান নিয়ে, কেউ নতুন নতুন রান্না নিয়ে আবার কেউ বা মেতেছিলেন বাগান বা অন্য কোনও শখের কাজে। একুশে সেই উৎসাহও বিলীন। আসলে আমরা সবাই ভেবেছিলাম, বিশ পার করা মানেই মারের সাগর পাড়ি দেওয়া। ফলে মানুষ বন্দীত্বকে মেনে নিয়েছিলেন, চেষ্টা করেছিলেন তাকে মনে না নেওয়ার। কিন্তু করোনার প্রলম্বিত অবস্থান, আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠা এবং আশু না-চলে যাওয়ার ইঙ্গিত মানুষের নিজেকে ভালো রাখার উদ্যোগে জল ঢেলেছে।
বেসরকারি ক্ষেত্রে যাঁরা কাজ করেন কিম্বা যাঁদের দিন আনি দিন খাই অবস্থা, তাঁদের করোনা ভীতির সঙ্গে আবার মিশেছে কর্মচ্যুতির ভয়, পরিবার প্রতিপালন করতে না পারার আশঙ্কা।
কবে আবার জীবনের সেই স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে আসবে, ফিরে আসবে আগের সেই চলাফেরার সাহস সবটাই এখনও অনিশ্চয়তায় মোড়া। খবরের কাগজ খুললে শুধুই হতাশার ছবি।
সভ্যতার বাঘমার্কা চেহারা কবেই চুপসে গেছে। বাঘ আমরা হতেও চাই না। বাঘ মানেই একটা আগ্রাসী চেহারা। সভ্যতার পক্ষে তা স্বস্তিদায়ক ছিল না কোনওকালেই। আমরা ফিরতে চাই গতির কাছে। ফিরে  পেতে চাই স্থিতির খপ্পরে চলে যাওয়া আমাদের গতিমার্কা জীবনটাকে। আর জোর গলায় বলতে চাই, ‘লড়াই মিটিল, আবার গতিমার্কা জীবন যথেষ্ট পাইবেন!’

(ছবি গুগল থেকে প্রাপ্ত)

Leave a Reply