কথাঃআবোলতাবোল -আমার স্কুটি

70 / 100 SEO Score

কথাঃ আবোলতাবোল

 

আমার স্কুটি

 

 

-‘একটা স্কুটি কিনলে কেমন হয়?’

-‘কেমন হয় মানে! বাইক-স্কুটি ছাড়া এযুগে চলে নাকি? রাতবিরেতে কত দরকার পড়ে! বাইক এই বয়সে চালনো শিখতে পারবেন না। কিন্তু স্কুটি চালানো খুব সহজ।’

-‘আমি পারব চালাতে?’

-‘পারবেন না কেন? মেয়েরা চালাচ্ছে-’

-‘মেয়েরা চালাতে পারলেই আমি পারব তার কী গ্যারান্টি! ছেলেরা পারে,এমন কোন কাজটা না   আজকাল মেয়েরা পারছে!’

-‘পারবেন,পারবেন। সাইকেল যখন চালাতে পারেন স্কুটিও পারবেন।’

স্কুটি কেনার আগে এই জাতীয় কথোপকথন আমার কার সঙ্গে না হয়েছে! কিন্তু মনস্থির করেও করতে পারছিলাম না। স্কুটি কেনার কথা মনে হলেই নানা ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনার ছবি আমার মনের মধ্যে এসে হাজির হচ্ছিল।  আবার কেনার সাধটাকেও তাড়াতে পারছিলাম না।

অবশেষে এগিয়ে এলেন স্কুটি চালাতে পারা এক বয়স্ক  সহকর্মী। বললেন -‘স্কুটি চালানো শুধু সহজ  নয়,মজাদারও। কীরকম জান? এই ধর তুমি সোফার উপর বসে আছে,গড়াতে গড়াতে সোফাটা এগিয়ে যাচ্ছে। তারপর ধরো,ভিড়ের মাঝখানে তোমার ওই ঠ্যাঙঠেঙে সাইকেল নিয়ে কত হ্যাপা!  সিট থেকে পা মাটিতে  না পৌঁছলে  থামার জন্য নেমে পড়তে হয়। কিন্তু স্কুটিতে এইসময় তুমি বসে বসে নিশ্চিন্তে চারপাশ দেখ। জ্যাম যদি একটু বেশি হয় স্টার্ট বন্ধ করে চাই কি লাইনে দাঁড়িয়ে একটু চোখ বন্ধ করে আরামও নিতে পার।’

-‘তাহলে তো খুবই মজার!’

-‘ মজার বলেই তো বাইরে বাচ্চারাও চালায়।’

বাচ্চারা চালায় শুনে আমি আনাড়ির মত বলে বসি-‘ড্রাইভিং লাইসেন্স কি করাতে হবে?’

-‘তা হবে। তবে রাস্তায় কেউ চেক করবে না। স্কুটির দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না। এটাকে এক ধরণের সাইকেলই ভাবে।’

এরপর আর স্কুটি না কিনে থাকা যায়!

স্কুটির দোকান বাড়ি থেকে পাঁচ কিমি। স্কুটি চালাতে পারে এমন একজনকে নিয়ে এক সকালে হাজির হলাম দোকানে।

স্কুটি পছন্দ করা,কেনা,কাগজপত্র তৈরি করা ইত্যাদি পর্ব চোকার পর হাতে স্কুটি এল ঘন্টা দুয়েকের মাথায়। বাড়ি অব্দি সঙ্গীই চালিয়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু মাঝামাঝি এসে রাস্তাঘাট ফাঁকা দেখে আমি  বললাম-‘হাতেস্কুটিটা আজই না হয় হয়ে যাক।’

স্কুটি থামল। সঙ্গী বুঝিয়ে দিল কীভাবে স্টার্ট দিতে হয়,কীভাবে ব্রেক ধরতে হয়,কীভাবে স্পিড বাড়াতে কমাতে হয়।

সব বুঝে নিয়ে আমি বসলাম চালকের আসনে আর সঙ্গী পিছনে। কিন্তু এক মিনিট যেতে না যেতেই আমার ডানহাতের বদান্যতায় স্পিড চড়ে গেল ব্যাপক। সঙ্গী চেঁচাতে শুরু করল। আমি অসহায়। দুজনে উলটে পড়লাম রাস্তার পাশের নয়ানজুলির মুখে।

পথচলতি দুজন এসে তুলল আমাদের। স্কুটিরও স্টার্ট বন্ধ করে সেটা খাড়া করল। আমাদের জামা প্যান্টে জল কাদা লেগে গেলেও ভাগ্য ভাল,স্কুটি অক্ষত।

বিকেলে দেখা হল সেই প্রেরণাদাতা সহকর্মীর সঙ্গে। একগাল হেসে শুধোলেন–‘স্কুটি কিনলে?’

আমিও একগাল হেসে উত্তর দিলাম-‘কিনলাম। কিন্তু স্কুটি কেন বলছেন, বলুন চলন্ত সোফা!’

পরে তাঁর আরও একটা কথা ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। কাগজপত্র ভুলে না নিয়ে বেরোনোয় রাস্তায় ধরা পড়ে একদিন মোটা ফাইন দিতে হয়েছিল আমাকে।

তবে তাঁর প্রেরণার জন্য আমার আফশোস ছিল না। বরং ছিল  কৃতজ্ঞতা। এমন প্রেরণা না পেলে হয়ত কেনাই হয়ে উঠত না।

স্কুটি কেনা হল,চড়াও শিখে গেলাম একদিন। মজার  কথা স্কুল করে ফেরার সময় ট্রেন থেকে নেমে একই সঙ্গে দুজনের স্কুটি-গ্যারেজে যাওয়া,স্কুটি বের করে স্টার্ট দেওয়া এসবের সুবাদে সহকর্মী থেকে  দুজনে সহ স্কুটিচালকও হয়ে গেলাম।

সহকর্মীর স্কুটি,এবং তা চালানোর ধরণধারণ এমনিতেই শহরে নাম করেছিল। আমিও স্কুটির সুবাদে অচিরেই বিখ্যাত হয়ে গেলাম। তবে দুজনের রকমসকম একেবারে আলাদা।

সহকর্মীর বিশাল চেহারা,আর মুখে হেলমেটটাও বেশ বড়। স্কুটিতে উঠে বসলেই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্রেরা আওয়াজ দিত, ‘এবার স্কুটি চলল মহাকাশ।’

অতবড় হেলমেটে আমারও তাঁকে মনে হত মহাকাশচারীই।

তাঁর স্কুটির বয়স অনেক। কিন্তু বয়সের তুলনায় সে বুড়িয়ে গেছে অনেক বেশি। স্টার্ট দিলেই গোঁ গোঁ আওয়াজ ওঠে। যাবার পথে কোনও পার্ক বা মাঠে আড্ডারত বুড়োরা সে আওয়াজে বিভ্রান্ত হয়।  আকাশের দিকে তাকিয়ে কেউ বলেই বসে-‘আজ আবার কে আসছে!’

অন্যদিকে আমার স্কুটি ঝাঁ চকচকে। হলে কী হবে? চালকের গুণে এটি নাকি দুনিয়ার শ্লথগতির যানের একটি। চেনা বন্ধুরা মজা করে বলে, ‘এবার চাকরির পরীক্ষাতেও এ নিয়ে প্রশ্ন আসবে।’ তবে এই শ্লথগতির জন্য কিন্তু নয়। আমার স্কুটি বিখ্যাত হয়ে উঠল তার এক শৃঙ্গের কারণে।

ল্যামপোস্টে ধাক্কা মেরে আমার স্কুটির একটা আয়না গোড়া থেকে এমনভাবে ভেঙ্গে গেল যে আর কিছু করা গেল না।

পাল্টাতে হলে দুটো আয়নাই পাল্টাতে হয়। কিন্তু গরজ বড় বালাই।  কে যাচ্ছে আবার পাঁচ কিমি পথ ভেঙে কোম্পানীর সার্ভিসিং সেণ্টারে!

তা ছাড়া ভেবে দেখলাম,আমরা নিজেরাও তো কত অপূর্ণতা নিয়ে চলেছি। বলতে গেলে সর্বাঙ্গসুন্দর আমরা কেউই নই। সেদিক দিয়ে স্কুটিটাও হোক না আমাদেরই প্রতিবিম্ব!

তবে এক-আয়না স্কুটিখানা চলে কিন্তু বেশ। কতটুকুই বা যত্ন করি! দশ বছর হয়ে গেল। এখনও  একটুও অন্যরকম আওয়াজ নেই। ইঞ্জিনটা বেশ শক্তিশালীই বলতেই হবে। এই জায়গায় স্কুটিটাকে আমার কেমন শিক্ষক-শিক্ষক লাগে।

মনে হয়,ও যেন বলতে চায়,বাইরেটায় তোমার হাত নেই। কিন্তু ভিতরটা তোমার।ও জায়গাটাকে দুর্বল হতে দিয়ো না কক্ষনো।

Ami Mishuk | আমি মিশুক কথাঃআবোলতাবোল -আমার স্কুটি

 

 

 

 

Leave a Reply